ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাত—এই পাল্টাপাল্টি অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংঘাতের এই বিস্তৃত পরিস্থিতি সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক ও তাঁদের পরিবারগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রনির্ভর এ যুদ্ধের ধ্বংসক্ষমতা যেমন ব্যাপক, তেমনি ঝুঁকির পরিধিও বড়।
ইরানে শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েক শ বাংলাদেশি রয়েছেন। আর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। গতকাল সোমবার পর্যন্ত দুজন বাংলাদেশির নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এই বাস্তবতায় প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই শনিবার ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর আসে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করে। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মার্কিন সেনা ও ইসরায়েলি নাগরিকদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের নাগরিকদের হতাহত হওয়ার খবর মিলেছে।
গত বছরের জুনে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার উত্তেজনার তুলনায় এবারের সংঘাত যে অনেক বেশি বিস্তৃত ও তীব্র, তা প্রথম তিন দিনেই স্পষ্ট হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও জর্ডানসহ একাধিক দেশে ইরানের হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পুরো অঞ্চলই কি বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও এই সংঘাতে সম্পৃক্ত হতে পারে—এমন শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এবং জাতিসংঘ, ওআইসি ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় সংস্থা এবং বড় শক্তিগুলো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিশ্ব আরও বড় ও বিপর্যয়কর যুদ্ধে নিমজ্জিত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। ইরানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীসহ কয়েক শ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তাঁরা সবাই নিরাপদে আছেন। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে—এই বিবেচনায় তাঁদের প্রয়োজন হলে নিরাপদে সরিয়ে আনার প্রস্তুতি আগেভাগেই রাখা উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশিদের ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়েছে। রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় নিহত তিনজনের একজন ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক সালেহ আহমেদ। একইভাবে বাহরাইনে আবুল মহসিন নামে আরেক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। সংঘাতপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে নিয়মিত পরামর্শ জারি রাখতে হবে। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি, দূতাবাসগুলোকে সংকটকালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়াতে হবে।
সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বিমান চলাচলেও পড়েছে। তিন দিনে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যমুখী প্রায় ১০২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে ফিরতেও পারেননি বহু যাত্রী। এতে কয়েক হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষের পথে, তাঁদের অনেকের বিদেশে কাজের পরিকল্পনা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চেয়েছে। তবে ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় বিদেশগামীদের যাতে সংকটে না পড়তে হয়, সে জন্য আরও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর অর্থনৈতিক অভিঘাতও কম হবে না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে নানামুখী অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা, বিস্তার ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে এখন থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
সুত্র: প্রথম আলো

