ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গাজার সমস্ত সীমান্ত পারাপার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি—এর মধ্যেই নতুন এই অবরোধ গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষকে গভীর খাদ্যসংকট ও সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে—তাদের হাতে থাকা খাদ্য মজুত আর মাত্র কয়েক দিন চলবে। বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অঞ্চলটির খাদ্য সরবরাহ প্রায় পুরোপুরিই আমদানিনির্ভর।
বিশ্বখ্যাত দাতব্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন জানিয়েছে, সীমান্ত বন্ধ থাকলে চলতি সপ্তাহেই তাদের খাদ্য মজুত শেষ হয়ে যাবে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা হোসে আন্দ্রেস জানিয়েছেন, তারা প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ মানুষের জন্য গরম খাবার সরবরাহ করেন। এই বিশাল কর্মসূচি চালিয়ে যেতে প্রতিদিন নতুন খাদ্য সরবরাহ প্রয়োজন।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজায় বর্তমানে মাত্র এক সপ্তাহের তাজা খাবার এবং প্রায় ১০ দিনের রুটি তৈরির আটা অবশিষ্ট রয়েছে। এর আগে গত বছরের গ্রীষ্মেও অবরোধের কারণে গাজায় চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ত্রাণ নিতে গিয়ে শত শত ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
ইরানে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই গাজার বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে ২৫ কেজি আটার বস্তা যেখানে ৩০ শেকলে পাওয়া যেত, এখন তা ৮০ থেকে ১০০ শেকলে বিক্রি হচ্ছে। চিনি, ভোজ্যতেল ও শিশুদের ডায়াপারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দামও দ্বিগুণ হয়েছে।
যারা ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি ও সঞ্চয় হারিয়েছেন, তাদের পক্ষে এই বাড়তি দামে খাদ্য কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বেশি দামে বিক্রির আশায় কিছু ব্যবসায়ী পণ্য মজুত করছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান ইয়ান ইগেল্যান্ড বলেছেন, দখলদার শক্তি হিসেবে গাজার বেসামরিক নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসরায়েলের আইনি দায়িত্ব। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবিক আইন পালনের বাধা হতে পারে না।
যদিও ইসরায়েলি সংস্থা ‘কোগাট’ নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সরবরাহ বন্ধের কথা বলেছিল, পরে সোমবার রাতে জানানো হয়েছে—মঙ্গলবার থেকে কেরেম শালোম সীমান্ত দিয়ে সীমিত পরিসরে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
স্থানীয় বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর মতে, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখন তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সেখানে কোনো কৌশলগত খাদ্য মজুত নেই। ফলে সীমান্ত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গাজার আকাশে যুদ্ধের ধোঁয়া, মাটিতে খাদ্যের সংকট—এই দ্বিমুখী সংকট এখন অঞ্চলটির লাখো মানুষের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

