যখন সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার অভাব দেখা দেয়, তখন বাইরের শক্তিগুলো খুব সহজে সেখানে জায়গা করে নিতে পারে। কিছু সংখ্যক ইরানি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করলে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। এই “আশাই” অনেক সময় তাদের কৌশলী ফাঁদে ফেলতে সাহায্য করে।
এটি ভাবা ভুল হবে যে ইরানিরা কেবল অন্ধভাবে পশ্চিমা ফাঁদে পা দিচ্ছে। বরং এটি অভ্যন্তরীণ বঞ্চনা এবং বাইরের সুপরিকল্পিত উস্কানির একটি মিশ্র ফলাফল। ইরান সরকার যখন এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর জন্য কাজ করা সহজ হয়ে যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সংঘাতের শিকড়:
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বর্তমান সংঘাত কেবল একটি সামরিক লড়াই নয়, বরং এটি শতাব্দীর সঞ্চিত ভূ-রাজনৈতিক লাভার এক প্রলয়ঙ্কারী বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে পশ্চিমা-পন্থী শাহ সরকারের পতনের পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের যে অবনতি শুরু হয়, তা ২০২৬ সালে এসে এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণের মুখে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচির দোহাই দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার চেষ্টা করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। বিশেষ করে ওবামা প্রশাসনের আমলে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়া এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমেরিকা যে যুদ্ধের বীজ বুনেছিল, তা ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের ঘটনাবলির মাধ্যমে এক বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে ইরানের সামরিক শক্তির অভাবনীয় উত্থান এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার ঘটনায় যখন পশ্চিমা বিশ্ব বিচলিত, ঠিক তখনই আমেরিকা ও ইসরায়েল তাদের পুরনো কৌশল ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা বিভাজন নীতির আশ্রয় নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, ইরানকে বাইরে থেকে আক্রমণ করে ধ্বংস করা কঠিন, তাই তারা দেশটির অভ্যন্তরীণ ফাটলগুলোকে বড় করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
থুসিডাইডিস ট্র্যাপ এবং পরাশক্তির পরাজয়ভীতি:
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস স্পার্টা ও এথেন্সের যুদ্ধ বিশ্লেষণ করে একটি অমর সত্য বলে গেছেন—যখন একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি তার ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব রক্ষায় মরিয়া হয় এবং একটি উদীয়মান শক্তি তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়, তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আজকের বিশ্বমঞ্চে আমেরিকা সেই প্রতিষ্ঠিত শক্তি, যে তার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একক মেরুকেন্দ্রিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ হারাতে বসেছে। অন্যদিকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এক অপরাজেয় উদীয়মান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা আজ গণতন্ত্রের বুলি আউড়ালেও মূলত এই ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ থেকেই নিজেকে বাঁচাতে এবং ইরানের নেতৃত্বকে সমূলে বিনাশ করতেই এই আত্মঘাতী যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে নৃসংশ অধ্যায়টি রচিত হলো যখন আমেরিকার সরাসরি মিসাইল হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি শাহাদাত বরণ করলেন। এটি কেবল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানের ওপর হামলা নয়, বরং এটি সমগ্র মুসলিম জাহানের একটি বিশাল অংশের আবেগের ওপর সরাসরি আঘাত।
জেফরি স্যাকসের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, আমেরিকা যখন তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে পিষ্ট করে, তখন তারা আসলে আন্তর্জাতিক আইনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।
অর্থনৈতিক সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ:
ইরানিদের একটি অংশ কেন আজ রাজপথে নিজ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে, তার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এক সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ষড়যন্ত্র। দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা ইরানে মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করেছে এবং শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্বকে এক চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করেই জানে যে, পেটে খিদে থাকলে মানুষের মগজ ধোলাই করা সহজ।
তারা ইরানের এই অর্থনৈতিক কষ্টকে পুঁজি করে ‘সফট পাওয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। স্যাটেলাইট চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং গ্লোবাল কালচারের মাধ্যমে ইরানি তরুণদের মধ্যে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের বর্তমান শাসন ব্যবস্থাই তাদের সব সমস্যার মূল। পশ্চিমা প্রচারণায় দেখানো হচ্ছে যে, আমেরিকা বা ইসরায়েলের সাথে আপস করলেই ইরানে উন্নতির জোয়ার বয়ে যাবে।
অথচ তারা একবারও বলছে না যে, ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়াতেও তারা একই গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যার পরিণাম আজ ধ্বংসস্তূপ আর দীর্ঘস্থায়ী হাহাকার। ইরানিদের একাংশ এই রঙিন স্বপ্নের মোহে অন্ধ হয়ে আজ নিজের দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়েছে, যা মূলত আমেরিকার বিছানো একটি মরণফাঁদ।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা ও গাজা থেকে নজর সরানো:
বর্তমান এই সংকটটি অনেকটা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা একটি পরিকল্পিত বিভ্রান্তিও বটে। গাজায় চলমান গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরের দখলদারিত্ব থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরাতে তারা ইরানকে টার্গেট করছে। তেল আবিব মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে যত বেশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে, বিশ্ব তত দ্রুত গাজার কথা ভুলে যাবে। ইসরায়েল চায় ইরানকে ছোট ছোট জাতিগত রাষ্ট্রে বিভক্ত করতে, যেমনটা তারা লেবানন বা সিরিয়ার ক্ষেত্রে চেয়েছিল।
তাদের কাছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আসলে একটি অজুহাত মাত্র। আসল উদ্দেশ্য হলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করা এবং তাদের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ ভেঙে দেওয়া। যখন ইরানি বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদ করে, তখন ইসরায়েলি ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেই প্রতিবাদকে উসকে দেয় এবং অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে যাতে দেশটিতে একটি গৃহযুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলা শুরু হয়।
ইরানিদের একটি অংশ বুঝতে পারছে না যে, তারা গণতন্ত্রের লড়াই করছে ভেবে আসলে ইসরায়েলের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করার দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠছে।
প্রতিশোধের মহাপ্রলয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব:
সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের পর ইরান এখন যে ‘কঠিন প্রতিশোধ’ বা ‘হার্ড রিভেঞ্জ’র ঘোষণা দিয়েছে, তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরানের প্রতিশোধের প্রথম ধাপ হতে পারে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে থাকা মার্কিন রণতরী এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের আক্রমণ।
এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যে খাদের কিনারায় দাঁড়াবে, তাকে ‘গ্লোবাল ইকোনমিক ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বলা যেতে পারে। হরমুজ প্রণালী হলো বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার মহাধমনী, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই পথ যদি ইরান অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২৫০ ডলার অতিক্রম করা কেবল সময়ের ব্যাপার। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি হবে একটি অর্থনৈতিক মরণফাঁদ।
জেফরি স্যাকস সতর্ক করেছেন যে, আমেরিকার এই হঠকারী সিদ্ধান্ত মুদ্রাস্ফীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেখানে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। অথচ এই ধ্বংসলীলার মূল হোতা আমেরিকা তার ‘ওয়ার ইকোনমি’ বা যুদ্ধ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মরিয়া।
ডলারের আধিপত্য বনাম রিসোর্স ন্যাশনালিজম:
এই সংঘাতের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ‘রিসোর্স ন্যাশনালিজম’ বা সম্পদের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব। ইরানের ভূগর্ভে তেলের পাশাপাশি রয়েছে লিথিয়ামের মতো অমূল্য খনিজ সম্পদ। আমেরিকা তার ক্ষয়িষ্ণু ডলার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত কারণ ইরান তার বাণিজ্যিক লেনদেনে ডলারের বিকল্প খুঁজছে এবং ব্রিকস-এর মতো শক্তিশালী জোটে যোগ দিয়েছে।
সর্বোচ্চ নেতার ওপর এই হামলা মূলত সেই অর্থনৈতিক বিদ্রোহ দমনেরই একটি সামরিক সংস্করণ। আমেরিকা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, যারা পেট্রো-ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে, তাদের সর্বোচ্চ নেতাদেরও রেহাই দেওয়া হবে না। তাই এটি কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, এটি একটি কারেন্সি ওয়ার বা মুদ্রাযুদ্ধ।
ইরানিদের যে অংশটি বিক্ষোভ করছে, তারা হয়তো অনুধাবন করতে পারছে না যে, তাদের আন্দোলন সফল হওয়ার অর্থ হলো ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি ও নিউক্লিয়ার ডিটারেন্সের ব্যর্থতা:
আমরা আজ যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা অনেকটা ১৯৩৯ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকার মতো। রাশিয়ার জন্য ইরানের স্থিতিশীলতা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ, কারণ ইরানের পতন মানে রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত উন্মুক্ত হওয়া। অন্যদিকে চীন তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল।
তাই এই সংঘাত কেবল ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধ নয়, এটি একটি বহুমেরু বিশ্ব গঠনের প্রসব বেদনা। পরাশক্তিদের এই ইগোর লড়াই বিশ্বকে একটি পারমাণবিক মহাপ্রলয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যখন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানকে মিসাইল দিয়ে হত্যা করা হয়, তখন ‘নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স’ বা পারমাণবিক প্রতিবন্ধকতার ধারণাটি ব্যর্থ হয়ে যায়।
ইরান হয়তো এখন বাধ্য হয়ে তাদের পরমাণু নীতির পরিবর্তন ঘটিয়ে দ্রুততম সময়ে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে হাঁটবে, যা পুরো বিশ্বের জন্য এক নতুন নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে।
পরবর্তী টার্গেট কে?
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কোনও আকস্মিক দুর্যোগ নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ছক। সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাত মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের মধ্যে যে মার্কিনবিরোধী চেতনার জন্ম দিয়েছে, তা অচিরেই এক সর্বাত্মক বিপ্লবে রূপ নেবে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইরানিদের একটি অংশ এখনও পশ্চিমাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের দেশকে দুর্বল করছে। ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেক সরকারকে হটিয়ে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ নেতার ওপর হামলা সেই একই সাম্রাজ্যবাদী লালসার নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ।
এই যুদ্ধ মূলত পুরনো বিশ্বব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন এক ব্যবস্থা গড়ার সংঘাত, যেখানে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার কেবল এক একটি প্রোপাগান্ডা। মধ্যপ্রাচ্যের এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতা এবং আঞ্চলিক অনৈক্য আজ প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য অশনি সংকেত। আজ ইরান আক্রান্ত, কিন্তু প্রশ্ন হলো—পরবর্তী টার্গেট কে? সৌদি আরব নাকি তুরস্ক? ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যারা বিদেশের সাহায্য নিয়ে নিজের ঘরের অভিভাবককে সরাতে চায়, তারা শেষ পর্যন্ত পরাধীনতার শৃঙ্খলেই আবদ্ধ হয়।

