মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
এ প্রেক্ষাপটে সামনে চলে আসেন আলী লারিজানি—যিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের একজন শান্ত, পরিমিত ও বাস্তববাদী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বাস্তববাদী ভাবমূর্তি থেকে কঠোর অবস্থান
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ মার্চ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি এক কঠোর বার্তা দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, তারা ইরানি জাতির হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছে এবং এর জবাব দেওয়া হবে।
তিনি আরো হুঁশিয়ারি দেন, ইরান শত্রুদের এমন শিক্ষা দেবে যা তারা ভুলতে পারবে না। সাম্প্রতিক হামলার আগে পর্যন্ত লারিজানিকে এমন কড়া ভাষায় খুব কমই দেখা গেছে।
বর্তমানে তিনি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং চলমান সংকটে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছেন। খামেনির মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় বিষয় পরিচালনায় গঠিত অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদের পাশাপাশি তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিজাত পরিবার থেকে উত্থান
১৯৫৮ সালের ৩ জুন ইরাকের নাজাফে এক প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লারিজানি। তাঁর বাবা মির্জা হাশেম আমোলি ছিলেন খ্যাতনামা আলেম। ভাইয়েরাও বিচার বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাদের পরিবারকে “ইরানের কেনেডি” বলে উল্লেখ করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরবর্তী সময়েও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বিপ্লবী নেতৃত্বের সঙ্গে। ২০ বছর বয়সে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোর্তেজা মোতাহরির কন্যাকে বিয়ে করেন।
শিক্ষাজীবন ও দর্শনচর্চা
রক্ষণশীল পটভূমি থাকা সত্ত্বেও লারিজানি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি শরীফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশ্চিমা দর্শনে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ১৮ শতকের জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ কর্মজীবন
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এ যোগ দেন। পরে সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান ছিলেন।
২০০৫ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়ী হননি। এরপর সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব ও প্রধান পারমাণবিক আলোচক নিযুক্ত হন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ-এর সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০০৭ সালে পদত্যাগ করেন।
২০০৮ সালে কোমের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে নির্বাচিত হয়ে টানা তিনবার স্পিকার ছিলেন (২০২০ পর্যন্ত)। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি—জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)—সংসদে অনুমোদনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
২০২১ ও ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে চাইলেও অভিভাবক পরিষদ তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে। তবে ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁকে আবারও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন।
কূটনীতিক থেকে প্রতিশোধের মুখপাত্র?
পুনঃনিয়োগের পর তাঁর বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ)-র সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন।
যদিও সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত তিনি কূটনৈতিক ভারসাম্যের পক্ষপাতী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনাকে তিনি “যুক্তিসঙ্গত পথ” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। তিনি এখন বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী নেতৃত্বের উত্তরাধিকারের পরিকল্পনা রয়েছে এবং নেতাদের হত্যা করে ইরানকে অস্থিতিশীল করা যাবে না।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান আঞ্চলিক দেশগুলোতে হামলা করতে চায় না, তবে যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো ঘাঁটি ব্যবহার করলে তা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
একসময় সতর্ক কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত আলী লারিজানি এখন প্রতিশোধের কঠোর বার্তার অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। তাঁর ভাষায়, ইরান এমন শক্তি প্রয়োগ করবে “যা তারা আগে কখনও অনুভব করেনি।”
সূত্র: ‘আল-জাজিরা’র ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

