ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ফলে যুদ্ধ পরিকল্পনা ও হামলার গতি ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত হয়ে উঠছে। এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সামরিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, এ প্রযুক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এতটাই কমিয়ে দিচ্ছে যে মানুষ কেবল যন্ত্রের সুপারিশ অনুমোদনের ভূমিকায় নেমে আসছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হামলার পরিকল্পনায় অ্যানথ্রোপিকের তৈরি এআই মডেল ক্লড ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তি ‘কিল চেইন’ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে। অর্থাৎ লক্ষ্য নির্ধারণ, আইনি অনুমোদন এবং হামলা শুরুর পুরো ধাপই উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত হচ্ছে।
এর আগে ইসরায়েল গাজায় লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহার করেছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযানে ইরানে প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

ডিসিশন কমপ্রেশন-সিদ্ধান্তের সময় কমছে:
গবেষকদের ভাষায়, জটিল সামরিক অভিযানের পরিকল্পনায় আগে যেখানে দিন বা সপ্তাহ লেগে যেত, এখন তা মিনিট বা সেকেন্ডে নেমে এসেছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘ডিসিশন কমপ্রেশন’। ফলে মানব সামরিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা অনেক ক্ষেত্রে এআই নির্ধারিত পরিকল্পনায় কেবল অনুমোদনের সিল দেওয়ার পর্যায়ে সীমিত হয়ে পড়ছেন।
২০২৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক অ্যানথ্রোপিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরসহ বিভিন্ন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থায় তাদের মডেল স্থাপন করে। একই সময়ে যুদ্ধপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালানটির টেকনোলজিস পেন্টাগনের সঙ্গে যৌথভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা দ্রুত গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ভূগোলের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্রেইগ জোন্স বলেন, এআই লক্ষ্য নির্ধারণে যে সুপারিশ করছে তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তার গতির চেয়েও দ্রুত। অতীতে যেসব অভিযানে দিন বা সপ্তাহ লাগত, এখন তা অল্প সময়েই একসঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে।

বেসামরিকদের মৃত্যুর অভিযোগ:
শনিবার দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই শিশু। বিদ্যালয়টি একটি সামরিক ব্যারাকের কাছে ছিল।
জাতিসংঘ এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ ঘটনার তদন্ত করছে।

হামলার বৈধতা নির্ধারণেও এআইয়ের ভূমিকা:
সর্বাধুনিক এআই ব্যবস্থা ড্রোন ফুটেজ, টেলিযোগাযোগ নজরদারি ও মানব গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সম্ভাব্য লক্ষ্য চিহ্নিত করতে পারে। প্যালানটির টেকনোলজিসের সিস্টেম মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে অগ্রাধিকারভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে। অস্ত্র নির্বাচন, মজুত পরিস্থিতি এবং আগের অভিযানের কার্যকারিতাও বিশ্লেষণ করে। এমনকি হামলার আইনি ভিত্তিও স্বয়ংক্রিয় যুক্তির মাধ্যমে মূল্যায়ন করে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ডেভিড লেসলি বলেন, এটি সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির নতুন যুগ। তবে তিনি সতর্ক করেন, এআই ব্যবহারে ‘কগনিটিভ অফ-লোডিং’ হতে পারে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের চিন্তাগত দায়িত্ব যন্ত্রের হাতে চলে গেলে মানুষ তার পরিণতি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

ইরানের সক্ষমতা ও সামনে চ্যালেঞ্জ:
ইরান ২০২৫ সালে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহারের দাবি করে। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এআই কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন জানায়, তারা অ্যানথ্রোপিকের ব্যবহার বন্ধ করবে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা মার্কিন নাগরিকদের নজরদারিতে তাদের এআই ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। তবে পর্যায়ক্রমে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে অপেনএআই পেন্টাগনের সঙ্গে সামরিক প্রয়োজনে নিজেদের মডেল ব্যবহারের চুক্তি করেছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্রেরণা জোশি বলেন, এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও দক্ষতা বাড়ায়। লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ছে। এটি দ্রুত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তদাতাদের সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইচালিত যুদ্ধ প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ভবিষ্যতের সামরিক কৌশল আমূল বদলে দিতে পারে। তবে মানবিক বিবেচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

