ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি মেয়েদের বিদ্যালয়ে হামলায় নিহত ১৬৫ শিক্ষার্থী ও কর্মীদের স্মরণে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের স্মরণে তেহরানের উদ্যোগে মিনাবে এক গণজানাজার আয়োজন করা হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আক্রমণের ফল।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারে দেখা যায়, মিনাব শহরের একটি বড় উন্মুক্ত চত্বরে হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছেন। সেখানে নিহতদের স্মরণে দোয়া ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।
গণজানাজার অনুষ্ঠানে পুরুষেরা ইসলামিক রিপাবলিকের পতাকা নাড়িয়ে স্লোগান দেন। অন্যদিকে নারীরা কালো চাদর পরে আলাদা একটি অংশে অবস্থান নেন।
অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে ‘আতেনা’ নামে এক কিশোরীর মা বলে পরিচয় দেওয়া এক নারী নিহতদের ছবি সংবলিত পোস্টার তুলে ধরেন। তিনি এই ঘটনাকে “আমেরিকার অপরাধের দলিল” বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“তারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে।”
তার বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করে এবং “নো সারেন্ডার” ধ্বনি তোলে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর মিনাবের এই হামলার ঘটনা ঘটে।
তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী বেসামরিক হামলা।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তারা জানিয়েছে, মিনাব এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো হামলার বিষয়ে তারা অবগত নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন,
“১৬০-এর বেশি নিষ্পাপ কিশোরীর কবর খোঁড়া হচ্ছে— যারা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে নিহত হয়েছে। তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।”
তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘প্রতিশ্রুত উদ্ধার’ মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন,
“গাজা থেকে মিনাব— নিরীহ মানুষ ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হচ্ছে।”
তেহরান আরও দাবি করেছে, দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিমান হামলার প্রভাব পড়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নির্বিচারে আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল, রেড ক্রিসেন্ট স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শন লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী শিক্ষা অধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ঘটনাটির একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন,
এটি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না তা নির্ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো তাদের হাতে নেই। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে স্কুল, হাসপাতাল বা অন্য কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন,
“এটি যদি আমাদের হামলা হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিরক্ষা দপ্তর বিষয়টি তদন্ত করবে।”
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু করে না।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, চলমান সামরিক অভিযানে বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তারা খতিয়ে দেখছে।
জাতিসংঘের শান্তি নির্মাণবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল রোজমেরি ডিকার্লো বলেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া মৃত্যুর খবর সম্পর্কে তারা অবগত।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে

