ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এসেছে। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা হোসাইনি খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করেছে প্রভাবশালী বিশেষজ্ঞ পরিষদ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় দীর্ঘ ৩৬ বছর ইরান শাসন করা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। হামলার সময় তিনি নিজ বাসভবনে অবস্থান করছিলেন। ওই ঘটনায় তার মেয়ে, জামাতা ও নাতনিও প্রাণ হারান। গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, খামেনিকে পবিত্র নগরী মাশহাদে দাফন করা হবে। রাজধানী তেহরানে বড় পরিসরে শোকানুষ্ঠানের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। তবে দাফনের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি সরাসরি জনসমক্ষে কম এলেও নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে আইআরজিসি এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, তদারকি ও অপসারণের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের। ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেমের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদই মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেয়। ১৯৮৯ সালে একই পরিষদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করেছিল। সেই হিসেবে গত চার দশকের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন।
তবে মোজতবার মনোনয়ন নিয়ে পরিষদের ভেতরে কিছু মতভেদ ছিল বলে জানা গেছে। কয়েকজন সদস্য আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। তবুও সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে তার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বেছে নেওয়া হয়।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহেদী রহমতির মতে, বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা অবকাঠামো সম্পর্কে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর ভাষায়, মোজতবা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাঁকে বাস্তববাদী পছন্দ হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এ সিদ্ধান্তে দেশের সব শ্রেণি সন্তুষ্ট নাও থাকতে পারে। জনমনে বিরোধ তৈরি হলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, সম্ভাব্য ইরানি নেতৃত্বের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাম্প্রতিক হামলার পর আর জীবিত নেই। তিনি ইঙ্গিত দেন, নতুন নেতৃত্ব আগের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।
ইরানে সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব দেশটির ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

