যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনা স্বল্পমেয়াদে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য রাজনৈতিকভাবে কিছু সুবিধা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন পুরস্কারজয়ী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক দাউদ কুতুব। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
নিবন্ধে কুতুব লিখেছেন, যুদ্ধে শত্রুপক্ষের নেতৃত্বকে নির্মূল করা একটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর হতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় অতীতে এমন পদক্ষেপ বহুবার বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
তার মতে, প্রধান শত্রুকে হত্যা করলে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জন সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খামেনিকে হত্যার পর নিজেদের ‘সাফল্য’ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরতে পারছেন। তবে ৮৬ বছর বয়সী অসুস্থ এই ধর্মীয় নেতা আগে থেকেই উত্তরাধিকার প্রশ্ন নিয়ে ভাবছিলেন, ফলে তাকে হত্যা করা সামরিক শক্তির বড় কোনো বীরত্বগাথা নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কুতুব বলেন, একজন নেতাকে হত্যা করলেই সংশ্লিষ্ট দেশে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের অনুকূল কোনো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা দেখায়, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে প্রায়ই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা এবং অভ্যুত্থানের ঝুঁকি বাড়ে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের উদাহরণ হিসেবে তিনি ইরাকের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মার্কিন বাহিনী দেশটির নেতা সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে ইরাকি মিত্রদের হাতে তুলে দেয় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে তার শাসনের অবসান ঘটে। এতে ইসরায়েলের প্রকাশ্য শত্রু নেতৃত্বের অবসান হলেও ইরাকে ইরানপন্থী শক্তির উত্থানের পথ তৈরি হয়।
এর ফলে পরবর্তী দুই দশকে ইরাক ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীগুলোর জন্য উর্বর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী এসব গোষ্ঠী দেশজুড়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
মার্কিন আগ্রাসনের পর নিরাপত্তা শূন্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে তিনি ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর উত্থানের কথা উল্লেখ করেন। সিরিয়া থেকে বিস্তৃত হয়ে আইএস মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সহিংসতা ছড়ায় এবং মার্কিন নাগরিকসহ হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। একই সঙ্গে ইউরোপমুখী শরণার্থী সংকটও তীব্র হয়ে ওঠে।
হামাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে বলে মতামতে উল্লেখ করা হয়। ২০০৪ সালে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন এবং পরে তার উত্তরসূরি আবদেল আজিজ রানতিসিকে হত্যার পরও সংগঠনটি দুর্বল হয়নি। বরং পরবর্তী সময়ে ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় হামাসের নেতৃত্বে আসেন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনা করেন।
হিজবুল্লাহর ইতিহাসও একই ধারা অনুসরণ করেছে। সংগঠনটির সাবেক নেতা হাসান নাসরুল্লাহ শক্তিশালী সামরিক কাঠামো গড়ে তোলেন, যদিও তার পূর্বসূরি আব্বাস আল-মুসাভিকেও ইসরায়েল হত্যা করেছিল।
প্রায় আড়াই বছর ধরে ইসরায়েল হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে তাদের নেতাদের হত্যা করলেও সংগঠনগুলোর আদর্শ বা মূল লক্ষ্য নির্মূল করা সম্ভব হয়নি বলে কুতুব উল্লেখ করেন। তার মতে, ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’ ধারণাই এসব গোষ্ঠীকে নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রাখছে।
ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খামেনির উত্তরসূরি যেই হোন না কেন, তার সঙ্গে আলোচনায় বসা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সহজ হবে না। মাস্কাট ও জেনেভায় আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ওমানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, খামেনির নেতৃত্বে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে এমন ছাড় দেওয়ার অবস্থানে থাকবে—এমন সম্ভাবনা কম।
কুতুব সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি অভিযান চালিয়ে যায় এবং ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চাপ বাড়ায়, তাহলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলাফল এখনই অনুমান করা কঠিন।
ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি মনে করেন, ইরানে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হলে তা শুধু অঞ্চল নয়, ইউরোপে মার্কিন মিত্রদের জন্যও গুরুতর সংকট ডেকে আনতে পারে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, নেতৃত্ব শূন্য করার কৌশলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আসলে কী অর্জন করবে। নেতানিয়াহুর জন্য এটি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে কাজ করতে পারে, কারণ সামনে নির্বাচনে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দুর্নীতির মামলার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে অর্জন স্পষ্ট নয় বলে মতামতে উল্লেখ করা হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সামনে দূরবর্তী দেশের এক অসুস্থ নেতাকে হত্যার সাফল্য তুলে ধরা রাজনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অনেক মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে ‘ইসরায়েলের যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কুতুবের মতে, ট্রাম্প এমন এক প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন, যিনি অন্য দেশের নেতার রাজনৈতিক টিকে থাকা নিশ্চিত করতে ব্যয়বহুল যুদ্ধ শুরু করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থলসেনা মোতায়েন করছে না, তবু একসময় অভিযান বন্ধ করে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং পেছনে থেকে যেতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা।
তিনি সতর্ক করেন, এই অভিযান শেষ পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের অর্থ, সেনাদের জীবন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে। তার আশা, ওয়াশিংটন একসময় বুঝতে পারবে যে নেতৃত্ব হত্যা বা শাসনব্যবস্থা উৎখাতের কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়।
সূত্র: আল জাজিরা

