ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তবে এত বড় আঘাতের পরও দেশটির সরকার এখনো ক্ষমতায় টিকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে একজন নেতার মৃত্যুর পরও নতুন উত্তরাধিকারী বেছে নিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের সরকার পতন ঘটাতে নতুন কৌশল সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল— এমন দাবি উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স–এর প্রতিবেদনে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শুরুতে বিমান হামলা চালিয়েও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন সরকারবিরোধী গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে। এমনকি এক সময়ের শত্রু হিসেবে পরিচিত ইসলামিক স্টেটের নেতা আহমেদ আল সারার গোষ্ঠীকেও গোপনে সহযোগিতা করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পরে আসাদ সরকারের পতনের পর তাকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং তার নাম সন্ত্রাসী তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়।
ইরানের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দ বাহিনীকে ব্যবহার করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।
তবে কবে এবং কীভাবে এই হামলা চালানো হবে সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার আগে কুর্দদের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চেয়েছে।
দুটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তাদের অস্ত্র সহায়তা দেবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর আগে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কুর্দ গোষ্ঠীগুলোকে সিআইএ সহায়তা দিতে পারে।
এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে কুর্দদের দুই প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলেও জানা গেছে।
কুর্দরা পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নেই। তারা প্রধানত তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক এবং ইরান—এই চারটি দেশে বসবাস করে।
ইরাকের আধাস্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চল থেকে তাদের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ইরান সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকেও ইরানের কুর্দ গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় রয়েছে।
সম্প্রতি কুর্দদের লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ধারণা করা হয়, ইরানে প্রায় ৮০ লাখের বেশি কুর্দ জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে, যা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ইরাক, লিবিয়া এবং আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের পর অনেক ক্ষেত্রে দেশে রক্তপাত ও অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
ইরাকে আইসিস এবং আফগানিস্তানে তালেবানের মতো শক্তির উত্থানও এমন পরিস্থিতির ফল বলে মনে করা হয়।
একই ধরনের পরিস্থিতি ইরানেও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের উদাহরণ সামনে রেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ইরানেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তৈরি হতে পারে।
সিরিয়ায় ২০২২ সালে শুরু হওয়া সংঘাত প্রায় ১৩ বছর ধরে চলেছিল এবং ২০২৪ সালে আসাদ সরকারের পতনের পরও পুরোপুরি শান্তি ফিরে আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

