মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। এই সংঘাতে ইতিমধ্যে ১,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই কূটনৈতিক অংশীদার রাশিয়া ও চীন যুদ্ধের নিন্দা করলেও তারা এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেনি।
এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের এত ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র থাকা সত্ত্বেও তারা কেন দূরত্ব বজায় রাখছে?
যুদ্ধের নিন্দা, কিন্তু সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকে “মানবিকতার সব নিয়মের বিরুদ্ধে এক নির্মম ঘটনা” বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার-কে বলেছেন যে “শক্তি প্রয়োগ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়” এবং তিনি সব পক্ষকে উত্তেজনা বাড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই দুই দেশ একসঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানেরও অনুরোধ করেছে।
সব মিলিয়ে বক্তব্যের দিক থেকে রাশিয়া ও চীন ইরানের পাশে দাঁড়ালেও বাস্তবে তারা এখনও যুদ্ধে সরাসরি জড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
কৌশলগত সম্পর্ক, কিন্তু সামরিক জোট নয়
রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। জানুয়ারি ২০২৫ সালে দুই দেশ একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও পরিবহন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়।
এর মধ্যে একটি বড় প্রকল্প ছিল এমন একটি পরিবহন করিডর, যা রাশিয়াকে ইরানের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।
এছাড়া দুই দেশ ভারত মহাসাগরে যৌথ নৌ-মহড়া করেছে। সর্বশেষ মহড়াটি হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ঠিক আগেই।
তবে এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আছে—
এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বা “মিউচুয়াল ডিফেন্স” ধারা নেই। অর্থাৎ কোনো এক পক্ষ যুদ্ধে জড়ালে অন্য পক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিকভাবে সহায়তা করতে হবে—এমন কোনো শর্ত এতে নেই।
রাশিয়ার ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের সদস্য ও সাবেক রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মহাপরিচালক আন্দ্রেই কোরতুনভ বলেন, রাশিয়ার ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তি অনেক বেশি বাধ্যতামূলক।
তার মতে, ওই চুক্তি অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া যদি কোনো যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে রাশিয়াকে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চুক্তিতে কেবল বলা হয়েছে—দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
তার মতে, বর্তমানে মস্কো ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তাই নতুন একটি বড় সংঘাতে জড়াতে তারা আগ্রহী নয়।
তবে তিনি জানান, তেহরানের কিছু মহলে রাশিয়ার এই অবস্থান নিয়ে হতাশা রয়েছে। অনেকেই আশা করেছিলেন মস্কো জাতিসংঘের কূটনৈতিক পদক্ষেপের বাইরে গিয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
চীন–ইরান সম্পর্ক: অর্থনীতি প্রধান
চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও বেশ গভীর, তবে সেটিও মূলত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে।
২০২১ সালে দুই দেশ একটি ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি করে। এতে জ্বালানি খাত, অবকাঠামো ও বাণিজ্যে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
চীনের ত্সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির গবেষক জোডি ওয়েন বলেন, বেইজিং ও তেহরানের সম্পর্ক মূলত বাস্তববাদী ও স্থিতিশীল।
তার মতে,
“রাজনৈতিকভাবে দুই দেশের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, আর অর্থনৈতিক সহযোগিতাও গভীর। অনেক চীনা কোম্পানি ইরানে বিনিয়োগ করেছে।”
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চীন দীর্ঘদিন ধরেই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়াতে চায় না।
তার ভাষায়,
“চীনা সরকার সাধারণত অন্য দেশের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে। আমি মনে করি না চীন ইরানে অস্ত্র পাঠাবে।”
কূটনীতিই চীনের প্রধান হাতিয়ার
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকা মূলত কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর মতো হতে পারে।
জোডি ওয়েন বলেন, বেইজিং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করবে।
তবে সম্পর্কের ভারসাম্য পুরোপুরি সমান নয়।
জাহাজ ট্র্যাকিং সেবা কেপলার (Kpler) এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বার্ষিক অপরিশোধিত তেলের রপ্তানির ৮৭.২ শতাংশই চীনে যায়। অর্থাৎ ইরানের জন্য চীন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।
কিন্তু চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় ইরান এখনও তুলনামূলক ছোট অংশীদার।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা চীনের লক্ষ্য
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লো মনে করেন, ইরানকে ঘিরে চীনের ভূমিকা এখন অনেকটা “সুরক্ষামূলক” হয়ে উঠেছে।
তার মতে, চীন মূলত এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতে দিতে চায় না যা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে এবং যার ফলে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন,
“চীন এখন পরিস্থিতির রাজনৈতিক ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায় এবং কী কী বিকল্প পথ আছে তা মূল্যায়ন করছে। আসলে এই পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় হামলার পর থেকেই।”
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, তা আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়।
এই কারণে তারা যুদ্ধের নিন্দা করছে, কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে, কিন্তু সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
বিশ্ব রাজনীতির এই বাস্তবতা আবারও দেখিয়ে দিল—
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে “বন্ধু” থাকলেও, যুদ্ধের সময় সবাই একইভাবে পাশে দাঁড়ায় না।

