মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় পাল্টা হামলা চালানো শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত ধীরে ধীরে এক ধরনের সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
তাদের সতর্কবার্তা হলো—এই সংঘাত যদি আর মাত্র এক সপ্তাহও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে করোনা মহামারির পর তৃতীয়বারের মতো বড় ধরনের পণ্য মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ দেখা দিতে পারে। আর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের ওপর।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত জেমস মিডওয়ের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বায়নের ভিত্তিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের উৎপাদন, সরবরাহ ও বাণিজ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সেই ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই জটিল কাঠামোর কারণে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় “চোক পয়েন্ট” বা চাপবিন্দু।
এই চাপবিন্দুগুলো মূলত এমন সরু সমুদ্রপথ বা বাণিজ্যিক করিডোর, যেগুলো দিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ পণ্য, কাঁচামাল এবং জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
মালাক্কা প্রণালি
-
পানামা খাল
-
ইয়েমেন ও ইরিত্রিয়ার মাঝের বাব এল-মান্দেব প্রণালি
-
হরমুজ প্রণালি
বিশ্ব বাণিজ্যে এই পথগুলোর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
-
মালাক্কা প্রণালি দিয়ে চীনের আমদানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবহন করা হয়।
-
এশিয়া ও ইউরোপের প্রায় ৪০ শতাংশ বাণিজ্য বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়।
-
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
ফলে এসব পথের যেকোনো একটি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিশ্বের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা অতীতেও ঘটেছে।
২০২৪ সালে পানামা খালে খরা এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতি বিদ্রোহীদের অবরোধ বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছিল।
সেই সময় বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে যায়।
এখন জলবায়ু সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মিলিয়ে এই বাণিজ্যপথগুলো আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বর্তমানে ইরান যুদ্ধের কারণে আরব উপদ্বীপের দুই পাশে থাকা হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
শুধু সামরিক ঝুঁকিই নয়, আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তাও এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে।
বড় বড় বীমা কোম্পানিগুলো পারস্য উপসাগরে যুদ্ধঝুঁকি নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌবাহিনীর সহায়তা ও বীমা সুরক্ষা দিয়ে বিভিন্ন দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার করার আশ্বাস দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি অনেকটা ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সময়ের মতো।
ইতিমধ্যে ইউরোপে গ্যাসের দাম কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
বর্তমানে আগের অর্ডার ও মজুতের কারণে সাধারণ মানুষ বড় ধরনের চাপ অনুভব না করলেও জুলাই মাসে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাব এল-মান্দেব প্রণালি শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের প্রায় ১৫ শতাংশ খাদ্যশস্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ফলে এই পথ অবরুদ্ধ থাকলে শিগগিরই যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য দেশগুলোকে এখনই বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
-
আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো
-
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো
-
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করা
-
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করা
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা একসঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

