তেহরান এখন যেন এক মৃত শহর। ব্যস্ত রাজধানী আজ অস্বাভাবিক নীরব, ফাঁকা আর আতঙ্কে মোড়া। ভিপিএনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পেরেছেন এমন এক বাসিন্দা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা ইরানশাহর স্ট্রিটের বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ। মানুষের চলাফেরা খুবই কম, আর চারদিকে যেন এক অদৃশ্য ভয়ের ছায়া।
ওই বাসিন্দার ভাষায়, পরিস্থিতি অনেকটা মহামারির দিনের মতো। তিনি বলেন, সবাই ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। কেউ জানে না, পরের মুহূর্তে কী হতে পারে। তারপরও ভেতরে ভেতরে মানুষের বিশ্বাস, আজ না হোক কাল এই পরিস্থিতির অবসান হবে, জীবন আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।
তিনি আরও জানান, এই অবস্থায় ছবি বা ভিডিও ধারণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবু তিনি ইরানশাহর স্ট্রিটের একটি স্থিরচিত্র ভাগ করেছেন। কয়েক মাস আগেও এই জায়গাটিই প্রাণবন্ত ছিল, যেখানে একটি রক ব্যান্ড গান গেয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। পরে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার ওই শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বিবিসিকে জানান, টানা পাঁচ দিন পর তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে তেহরানের নাফত স্ট্রিট দিয়ে হেঁটেছেন। এটি একটি আবাসিক এলাকা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাতে এক্সপিডিয়েন্সি ডিসকার্নমেন্ট কাউন্সিলের প্রশাসনিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা হয়েছিল। এরপর আশপাশে নিরাপত্তা বাহিনী চেকপোস্ট বসিয়েছে। তিনি সৌভাগ্যক্রমে বাধা ছাড়াই হেঁটে যেতে পেরেছেন। তবে কাছের ইরানশাহর স্ট্রিট ছিল পুরোপুরি জনশূন্য।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে বৃহস্পতিবার ইরানও ইসরায়েলের দিকে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে ১ হাজার ৪৫ জনসহ বিভিন্ন দেশে মোট ১ হাজার ৩৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রয়টার্সের তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি, মোট ১ হাজার ৩৪৮। তাদের মধ্যে ইরানে ১৭৫ স্কুলছাত্রীসহ ১ হাজার ২৩০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন ১০ বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭-এ। এ ছাড়া বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিরিয়া, ইরাক ও মার্কিন বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর খবরও এসেছে।
যুদ্ধের বিস্তার এখন শুধু ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক সতর্কতার খবর মিলছে। তেহরানের বিভিন্ন প্রান্তে বৃহস্পতিবার সকালেও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাজধানীর বাইরে ইরানের আরও কয়েকটি শহরে সামরিক সদরদপ্তর ও রাজনৈতিক স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং ছয় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান ঠেকাতে আনা একটি প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে ৫৩-৪৭ ভোটে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে কড়া ভাষায় বলেছেন, ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি দেখবে এবং তেহরানে শুধু মৃত্যু ও ধ্বংস দৃশ্যমান হবে। একই সময়ে ইরানের প্রায় পুরো ইন্টারনেট ব্যবস্থা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। দেশটির নাগরিকদের পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরানে দুই হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, এতে ইরানের শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ২০টি নৌযানও ধ্বংস করা হয়েছে, যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা উপকূলে ডুবিয়ে দেওয়া একটি সাবমেরিনও রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি বলছে, তাদের পাল্টা হামলাও অব্যাহত রয়েছে। তারা জানিয়েছে, ১৭ ও ১৮তম দফার হামলায় ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কয়েকটি উন্নত রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুয়েতে আরিফজান ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ওপর আবারও ড্রোন হামলার দাবিও করেছে তারা।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরান বৃহস্পতিবার ভোরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লে লাখো ইসরায়েলি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হন। তবে ইসরায়েলের জরুরি সেবা সংস্থার বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, এই হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। জেরুজালেমেও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল আবিব ও জেরুজালেমে হামলার সতর্কতায় সাইরেন বাজতে শোনা গেছে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, কাতার, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। বাহরাইন প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ৭৫টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২৩টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। কাতারের রাজধানী দোহায়ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মার্কিন দূতাবাসের কাছাকাছি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও খবর এসেছে।
আইআরজিসি দাবি করেছে, তাদের নৌবাহিনী উত্তর উপসাগরে একটি মার্কিন ট্যাঙ্কারে আঘাত করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজকেও এ অঞ্চলে ছাড় দেওয়া হবে না। ইরানের তাসনিম নিউজের বরাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার তাদের রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, কুয়েত উপকূলে একটি ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তবে সব নাবিক নিরাপদ আছেন।
ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে তারা ইরানে ১ হাজার ৩৩২টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করেছে। এসবের মধ্যে কমপক্ষে ১০৫টি ছিল বেসামরিক স্থানে। ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং সাতটি রেড ক্রিসেন্ট ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। ইরানের ১৭৪টি শহরে হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ আরও বলছে, হামলায় ১১টি হাসপাতাল এবং ৩ হাজার ৬০০টির বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাইয়ের অভিযোগ, সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাব এখন আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেও নড়িয়ে দিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমার বাইরে থাকা ইরানি যুদ্ধজাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে এক ভয়াবহ নজির স্থাপন করেছে এবং এর জন্য তাদের অনুশোচনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধজাহাজটি ভারতের নৌবাহিনীর অতিথি ছিল। শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই হামলার ঘটনায় ৮৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩২ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
আজারবাইজানও জানিয়েছে, নাখচিভান অঞ্চলের একটি বিমানবন্দরে দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে এবং এ ঘটনায় তারা ইরানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সময়ে ইরান ইরাক সীমান্তে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে বাগদাদকে সতর্ক করেছে। উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানি বলেছেন, জীবন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে সামরিক উত্তেজনার অংশ হওয়া উচিত নয়।
রাশিয়ার ক্রেমলিন জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের সময় তারা ইরানের কাছ থেকে অস্ত্র সহায়তার কোনো অনুরোধ পায়নি। তবে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলার মাধ্যমে আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ইউরোপের কয়েকটি দেশ সাইপ্রাসে সামরিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, এই সংঘাতে অন্তত ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে গত কয়েক দিনে তেহরান থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ১ লাখ মানুষ, লেবাননে ঘরছাড়া হওয়া ৮৪ হাজারের বেশি মানুষ এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে স্থানচ্যুত প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার মানুষ রয়েছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থার প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ। তার ভাষায়, ইরানের হুমকির কারণে নৌ-বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রমোদতরীর প্রায় ১৫ হাজার যাত্রীও দুর্ভোগে পড়েছেন।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তেহরান শুধু একটি শহর নয়, বরং এক অবরুদ্ধ মানসিক অবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সড়ক ফাঁকা, ইন্টারনেট প্রায় অচল, মানুষ ঘরবন্দী, আর আকাশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়। অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, ধ্বংস আর মৃত্যুর মধ্যেই এখন দিন কাটছে লাখো মানুষের।

