যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদেশে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে এমন পরিকল্পনা করেছিল যে, ইরান যুদ্ধেও কম সংখ্যক মার্কিন সেনা হতাহতের মুখোমুখি হবে এবং অর্থনীতির ওপর প্রভাব সীমিত থাকবে। তবে ইরানে সাম্প্রতিক সংঘাতের শুরুর দিনগুলোর পরিস্থিতি এই হিসাব–নিকাশকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
ইতিমধ্যেই ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো হামলার মুখোমুখি হয়েছে। শেয়ারবাজারে টালমাটাল অবস্থা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দামসহ গ্যাসের দামও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার খরচ করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্বিচার বিমান হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন ঘটনার দায়কে চিহ্নিত করতে তদন্ত করছে এবং প্রাথমিক মার্কিন তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে, এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র দায়ী হতে পারে।
এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন স্থল সেনা ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার সংবাদসংস্থা সংক্রান্ত আলোচনায় বলেছিলেন, সংঘাত হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হবে না। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গতি কমাচ্ছি না, বরং আরো বাড়াচ্ছি।’
গত শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় আগ্রাসন শুরু করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই আগ্রাসন চালানোর সিদ্ধান্তে পূর্ববর্তী সময়ের ধারাবাহিক সামরিক সাফল্য তাদের সাহস এবং আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছিল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানগুলো দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে এবং কম ক্ষতি ও খরচের মধ্যে সীমিত ছিল।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক ও প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা জ্যাসন ক্রো সতর্ক করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘অনন্ত যুদ্ধের পথে’ এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ কোটি ডলার খরচ, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি এবং বহু দশকের অন্তহীন সংঘাত—এগুলোই আমরা আবার দেখতে যাচ্ছি।’

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তবে সরকারবিরোধী লড়াইয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সত্তাকে সমর্থন করেননি। তিনি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু ইরানি সরকার উৎখাতের জন্য সরাসরি অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনায় সহমত হননি।
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষক জন হফম্যান বলেন, ট্রাম্প কম খরচে চমকপ্রদ বিজয় পছন্দ করেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি পূর্বের অভিযানের তুলনায় ভিন্ন এবং খরচ ইতিমধ্যেই বেড়েছে। তিনি ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো এলিয়ট আব্রামস মনে করেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সামরিক হামলা এবং তাদের ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য সুবিধা আনবে। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ বেশি হবে। শাসকগোষ্ঠীকে পরাস্ত করলে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষমতা থাকবে না।’
হফম্যান আরো সতর্ক করেছেন, ইরানে বিভাজন সৃষ্টি করার পরিকল্পনা মার্কিন ও তার মিত্রদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যে ছায়া যুদ্ধ নয়, পুরো অঞ্চলকে অবিশ্বাস্য মাশুল দিতে হতে পারে। ব্যাপক শরণার্থীপ্রবাহ, আইএসআইএসের মতো গোষ্ঠীর সক্রিয়তা—এসবই হবে ফলাফল।’

