ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদির বর্তমান কর্মভার ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং প্রভাবশালী দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি এমন এক পদ, যেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যু ও ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। এমন এক কঠিন সময়ে ওয়াহিদি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কমান্ড গ্রহণ করেছেন, যখন দেশটি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানের মুখোমুখি।এই অভিযানে ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, ইরানের শহরগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে এবং দেশটির শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
আইআরজিসি-র শীর্ষ পদের ঝুঁকিটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এলিট কুদস ফোর্সের দীর্ঘদিনের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি ২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ড্রোন হামলায় নিহত হন। সাম্প্রতিক আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরও ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার শুরুর দিকে প্রাণ হারান। পাকপুরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তার পূর্বসূরি হোসেন সালামি নিহত হওয়ার পর; যাকে ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় হত্যা করেছিল ইসরায়েল।
আইআরজিসি-র শীর্ষ নেতৃত্বে এই ঘনঘন রদবদলই প্রমাণ করে যে ইরানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের এই পদটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এখন ওয়াহিদির কাঁধে এমন দায়িত্ব আছে যা খোদ সোলেইমানিও পাননি: একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ময়দানে ইরানের সামরিক শক্তির অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেওয়া।
কে এই আহমাদ ওয়াহিদি?
আইআরজিসি-র নতুন প্রধান হিসেবে ওয়াহিদির নাম আসাটা অবাক হওয়ার মতো নয়। গত ডিসেম্বরে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাকে ডেপুটি চিফ হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এর আগে তিনি ইরানের সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, খামেনি যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে আইআরজিসি-র শুরুর দিনগুলো থেকেই ওয়াহিদি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আশির দশকে গোয়েন্দা ও সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি ধাপে ধাপে পদোন্নতি পান। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি এলিট কুদস ফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৯৮ সালে তিনি সোলেইমানির কাছে কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব হস্তান্তর করেন।
ওয়াহিদি নিজেকে ইসলামি বিপ্লব রক্ষায় নিবেদিত প্রকাশ করেছেন। ডিসেম্বরে ডেপুটি চিফ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সময়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামি বিপ্লব রক্ষা করা বিশ্বের অন্যতম মহৎ গুণ এবং ইসলামি ব্যবস্থার বিরোধিতা করা সবচেয়ে বড় মন্দ কাজ।’ ২০২৫ সালে ‘প্রেস টিভি’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবকে ‘আলোর বিচ্ছুরণ’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা অঞ্চলের ও বিশ্বের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
তেহরানের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ওয়াহিদি বাস্তববাদী হিসেবেও পরিচিত। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের গোপন যোগাযোগে অংশ নিয়েছিলেন, যা ‘ইরান-কন্ট্রা অ্যাফেয়ার’ নামে পরিচিত। ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘আরব গালফ স্টেট ইনস্টিটিউট’-এর ইরান বিশেষজ্ঞ আলী আলফোনেহ আল জাজিরা বলেন, এই আলোচনার মাধ্যমে ওয়াহিদি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ‘অত্যন্ত নিবিড় ধারণা’ লাভ করেছেন।
ওয়াহিদি কেবল সামরিক কর্মকর্তা নন; তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের অধীনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির অধীনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে বিদায় নেন। আলফোনেহ তাকে একজন ‘দক্ষ আমলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার অভিজ্ঞতা তাকে আইআরজিসি-র আদর্শ প্রধান কমান্ডার হিসেবে তৈরি করেছে।
অভিযোগ ও বিতর্ক:
দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনে ওয়াহিদির বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে আর্জেন্টিনার অনুরোধে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করেছিল। ১৯৯৪ সালে বুয়েনস আইরেসের এএমআইএ ইহুদি কেন্দ্রে বোমা হামলার ঘটনায় তার কথিত ভূমিকার জন্য এই নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে ৮৫ জন নিহত হন। ইরান এই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে এবং নোটিশটিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেছে।
এছাড়া ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে বিক্ষোভ দমন সংক্রান্ত কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ‘আমওয়াজ’-এর প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, ওয়াহিদি তার পূর্বসূরীদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। তিনি বলেন, ‘এই ব্যক্তি অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ইসরায়েলের কারণে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানগুলো পূরণে কট্টরপন্থীরা একটুও সময় নষ্ট করছে না।’
আইআরজিসি-র ভবিষ্যৎ ও চ্যালেঞ্জ:
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ওয়াহিদিকে রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব দিয়েছে। বিশেষ করে অনেক শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পর এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিছু সামরিক ইউনিট স্বাধীনভাবে কাজ করছে। আলী আলফোনেহ জানিয়েছেন, সাবেক আইআরজিসি প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ-আলী জাফারি ইচ্ছাকৃতভাবে আইআরজিসি বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলেন যাতে শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলেও সংস্থাটি টিকে থাকে।তিনি মনে করেন, ওয়াহিদি এই কাঠামো সমন্বয় করার জন্য সর্বোচ্চ যোগ্য ব্যক্তি।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অলওয়ালিদ সেন্টার-এর পরিচালক নাদের হাশেমি বলেন, ইরানের নেতারা এখন আইআরজিসি প্রধান হিসেবে ‘সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রার্থী’ খুঁজছেন। যিনি শীর্ষ নেতাদের হত্যার পর প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সৈনিকদের লড়াই চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হবেন। হাশেমি আরও বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা আইআরজিসি-র ওপর নির্ভরশীল। এই ধরণের মুহূর্তের জন্যই তাদের তৈরি করা হয়। এই আক্রমণ থেকে টিকে থাকা ও পাল্টা লড়াই করার ক্ষমতার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।’
সূত্র: আল জাজিরা

