মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে রাশিয়া—এমন দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএন। এই অভিযোগকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্পর্কের সমীকরণে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে গত শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন রণতরি, যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক সম্পদের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য ইরানকে জানাচ্ছে মস্কো। তিনজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এসব সংবেদনশীল তথ্য নিয়মিতভাবে তেহরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে একই ধরনের দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা, রণতরি ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান এবং চলাচল সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপন তথ্য ইরানের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে রাশিয়া।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার কক্ষপথে থাকা অত্যাধুনিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংগৃহীত ছবি ও তথ্য তেহরানকে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এই সহযোগিতার বিনিময়ে মস্কো ইরানের কাছ থেকে ঠিক কী সুবিধা পাচ্ছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে অবস্থিত রুশ দূতাবাসের মন্তব্য জানতে চেয়েছে সিএনএন। যদিও এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে ইরানের চালানো কোনো নির্দিষ্ট হামলা রাশিয়ার সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে কি না, সে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও ইরানকে আর্থিক সহায়তা, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও বেইজিং এখনো সরাসরি এই সংঘাতে জড়ায়নি।
এ বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে এই সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলার খবর পাওয়া গেছে আজারবাইজান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশ থেকেও।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘বিনা উস্কানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। মস্কোর সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতির ফলে ইরানে এমন শক্তির উত্থান ঘটতে পারে, যারা সেই পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে এগোবে—যা যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে।
তবে ইরানকে রাশিয়া ঠিক কতটা এবং কীভাবে সহায়তা করছে, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের এক সপ্তাহ না পেরোতেই মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে।

অন্যদিকে হামলার তীব্রতা কমানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না মার্কিন বাহিনী। ইরান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।”
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ শুক্রবার দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই একমাত্র পথ। এরপর এক বা একাধিক যোগ্য নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এবং আমাদের বীর মিত্র রাষ্ট্র ও অংশীদারেরা ইরানকে ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করব। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে আরও বড়, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলা হবে।”
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরান ও তেহরানের বিরুদ্ধে হামলার তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আরও যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান পাঠানো হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতাও পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হবে।
এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার পরোক্ষ সমর্থনের খবর ট্রাম্প ও পুতিনের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের তুলনায় পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বরাবরই বেশ উষ্ণ ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ট্রাম্পকে একাধিকবার পুতিনের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে দেখা গেছে।
যদিও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি। তিনি বলেন, বর্তমানে ইরান প্রশাসন কার্যত কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। তার দাবি, “ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা প্রতিদিন কমছে। তাদের নৌবাহিনী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও কার্যত লড়াই করতে পারছে না।”
গত তিন বছর ধরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে তেহরান ও মস্কো একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরান যেমন রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, তেমনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতেও মস্কো প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে।
পেন্টাগনের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। এই অভিযানের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার সেনা, ২০০টির বেশি যুদ্ধবিমান এবং দুটি বিশাল রণতরি মোতায়েন করেছে ওয়াশিংটন।
সূত্র: সিএনএন

