মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ। এই দুই আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব বহু বছর ধরেই পুরো অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেহরানের হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর ফলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান কতদিন নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পারবে—এই প্রশ্ন এখন দেশটির রাজনীতি ও কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত অঞ্চল বহু বছর ধরেই নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা ইস্যু, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং সীমান্ত উত্তেজনা দেখা গেছে। ফলে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত বা উত্তেজনা পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এ কারণে ইসলামাবাদ সবসময়ই তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে থাকে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এসব দেশে লাখ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি পাকিস্তান সহজে নিতে পারে না।
বিশেষ করে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।
ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই চুক্তির ফলে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতায় দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের পরিধি যেভাবে বাড়ছে, তাতে পাকিস্তানের জন্য ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও প্রতিবেশী সম্পর্ক, অন্যদিকে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক—এই দুই বাস্তবতার মাঝে পাকিস্তানকে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
বিশেষ করে যদি এই আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে ইসলামাবাদকে হয়তো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক সক্ষমতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি সংঘাত আরও তীব্র হয়, তাহলে পাকিস্তান কোন পক্ষ নেবে—নাকি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করবে—তা নিয়ে দেশটির ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মহলেও নানা আলোচনা চলছে।
এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক কৌশলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

