মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার সরাসরি ধাক্কা এখনো চীনের গায়ে না লাগলেও এর প্রভাবের ঢেউ তারা অনুভব করতে শুরু করেছে। স্বল্পমেয়াদে বেইজিংয়ের কাছে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে। প্রয়োজনে তারা প্রতিবেশী রাশিয়ার কাছ থেকেও সহায়তা নিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংঘাত চীনের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে এখন হিসাব কষছে দেশটি।
এই সপ্তাহে বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির হাজারো প্রতিনিধি বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় সংকোচনের চাপ, সম্পত্তি খাতের দীর্ঘদিনের সংকট এবং বিপুল স্থানীয় ঋণের বোঝার মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি কীভাবে এগোবে—এটাই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়।
১৯৯১ সালের পর প্রথমবারের মতো চীনা সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমিয়েছে, যদিও উচ্চ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। বেইজিং হয়তো ভেবেছিল রপ্তানি বাড়িয়ে তারা অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু গত এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যসংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অঞ্চল দিয়েই চীনের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ এবং জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ আসে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে, বিশেষ করে যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ফিলিপ শেটলার-জোন্স মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে অস্থিরতা চললে তা অন্য অঞ্চলগুলোকেও প্রভাবিত করবে। তার মতে, আফ্রিকার অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ থেকে লাভবান হয়েছে। সেই বিনিয়োগ কমে গেলে সেখানে অস্থিরতা বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত চীনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলেন, এই যুদ্ধের পেছনে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে, তা নিয়ে চীনও ভাবছে। তার মতে, অনেকের মতো চীনও মনে করতে পারে যে স্পষ্ট কোনো কৌশল ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, চীন এই সংঘাতে জড়াতে চায় না, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তাদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
সম্পর্ক থাকলেও সীমিত ঘনিষ্ঠতা:
পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে চীনের মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন। দুই দেশের সম্পর্কও একসময় বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। বেইজিংয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদেশ সফর ছিল ১৯৮৯ সালে। সে সময় চীনের মহাপ্রাচীরের সামনে তার একটি ছবিও তোলা হয়েছিল।
২০১৬ সালে শি জিনপিং তেহরান সফর করলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পরে ২০২১ সালে তারা ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী চীন ২৫ বছরে ইরানে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিনিময়ে ইরান চীনকে নিয়মিত তেল সরবরাহ করবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিশ্রুত অর্থের খুব অল্প অংশই বাস্তবে ইরানে পৌঁছেছে। কিন্তু ইরান থেকে চীনে তেলের প্রবাহ বন্ধ হয়নি। সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির প্রায় ১২ শতাংশ।
অভিযোগ রয়েছে, এসব তেলের অনেক চালানকে মালয়েশিয়ার তেল হিসেবে পুনরায় লেবেল দেওয়া হয়েছিল, যাতে উৎস গোপন থাকে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এশিয়ায় ভাসমান সংরক্ষণে ৪৬ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল ইরানি তেল রয়েছে। এর বাইরে চীনের দালিয়ান ও ঝৌশান বন্দরের বন্ডেড সংরক্ষণাগারেও আরও তেল মজুত আছে, যা এখনো কাস্টমস ছাড়পত্র পায়নি। সেখানে ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ট্যাংক ভাড়া নিয়ে তেল সংরক্ষণ করে।
দুই দেশের মধ্যে অস্ত্র বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। যদিও চীন তেহরানকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, চীন ইরানের প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সহায়তা করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, বিক্ষোভকারী ও সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে ইরানের দমন অভিযানে চীনের দেওয়া মুখ শনাক্তকরণ ও নজরদারি প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হয়েছে।
এসব কারণে অনেক সময় কিছু সংবাদমাধ্যম চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়াকে একসঙ্গে বিশ্ব অস্থিরতার একটি জোট হিসেবে তুলে ধরে। তবে বাস্তবে চীন ও ইরানের সম্পর্ক অনেকটাই লেনদেনভিত্তিক।
কেরি ব্রাউনের মতে, দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নেই। অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান একটি স্থায়ী বিরক্তির কারণ হওয়ায় তা চীনের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক ছিল। তার ভাষায়, নেতিবাচক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী বা গভীর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
চীন পশ্চিমা দেশগুলোর মতো করে মিত্রতার ধারণাকে দেখে না। তারা সাধারণত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে না এবং মিত্র দেশের জন্য দ্রুত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে না। বরং বেইজিং সাধারণত যে কোনো ধরনের সংঘাতের বাইরে থাকতে চায়।
মিত্রদের সহায়তার সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা:
তবে এর মানে এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন নয়। বেইজিং ইতোমধ্যে হামলার নিন্দা জানিয়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে যে চীনের অংশীদার দেশগুলোর প্রতি তাদের সহায়তারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেইজিং মূলত পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থেকেছে এবং সরাসরি কোনো সহায়তা দিতে পারেনি।
ফিলিপ শেটলার-জোন্স বলেন, চীন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়ে দিচ্ছে প্রকৃত পরাশক্তি হওয়ার অর্থ কী—বিশ্বের যে কোনো স্থানে গিয়ে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার সক্ষমতা।
তার মতে, অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও চীন এখনো সেই পর্যায়ের সামরিক পরাশক্তি নয় এবং মিত্রদের রক্ষায় সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার মতো সক্ষমতাও সীমিত।
এই পরিস্থিতিতে শি জিনপিং নিজেকে একজন স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে একটি কৌশল হতে পারে।
লন্ডনের এসওএএস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, চীনের যুক্তি হতে পারে যে এই সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো যে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কথা বলে, বাস্তবে সেখানে দ্বিচারিতা রয়েছে।
তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব পশ্চিমা দেশের তুলনায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে বেশি পড়তে পারে।
একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার সুযোগও দেখছে চীন। ইতোমধ্যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওমান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বেইজিং জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে একজন বিশেষ দূত পাঠাবে।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য সফর ঘিরে সতর্কতা:
তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ মাসের শেষ দিকে একটি বৈঠকের জন্য চীন সফরে আসার কথা রয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার সমালোচনা করলেও চীন সরাসরি ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে কোনো মন্তব্য করেনি। এতে সম্ভাব্য বৈঠকটি তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সফরটি আদৌ হবে কি না তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও সম্ভাবনাই বেশি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সফর নিয়ে আলোচনা করতে দুই দেশের কর্মকর্তারা শিগগিরই বৈঠকে বসবেন।
ফিলিপ শেটলার-জোন্স বলেন, চীন এই সফরকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান বোঝার একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ানের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করবে বেইজিং।
তার মতে, এই যুদ্ধ যদি যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন সংযত থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতি চীনের জন্য আরও সুবিধাজনক হতে পারে।
এই সংকটকে ঘিরে বিভিন্ন মহল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ উসকে দেওয়া দেশ হিসেবে তুলে ধরছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বার্তা ছড়িয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

