ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থনে কাজ করছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই সংঘাতে নতুন গোষ্ঠীগুলোর যুক্ত হওয়া জটিলতা বাড়াচ্ছে এবং সহিংসতা আরো বিস্তৃত করছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ককে সরাসরি লক্ষ্য করছে। এই গোপন লড়াইয়ে ইরাক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েল, জর্ডান এবং ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি তারা উত্তর ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ইরানি-কুর্দিবিরোধী গোষ্ঠীর অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা এবং স্থলে বিশেষ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীর ক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি উত্তর ইরাকের এরবিল বিমানবন্দরেও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরান-সমর্থিত একাধিক গোষ্ঠী। একই সঙ্গে জর্ডান ও কুয়েতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
২০০৩ সালের মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর ইরাক একটি প্রোক্সি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। তবে দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব এই সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হতে চাইছে না।
ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায় থেকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য নিয়োগ করা হয়। তারা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে কাজ করে।
উত্তর-পশ্চিম ইরানে আক্রমণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি ইরানি-কুর্দিদের সংগঠিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে এই গোষ্ঠীগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ইরাক ও অঞ্চলে থাকা ইউরোপীয় বাহিনী ও ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলার হুমকিও দিয়েছে।
ইরাকের দক্ষিণের বসরা প্রদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা আটকানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চিং প্যাড জব্দ করেছে।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, ইরাক থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে তার সংখ্যা কম ছিল।
নিউইয়র্কভিত্তিক ‘হরাইজন এনগেজ’-এর বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটস বলেন, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করছে এবং তারা খামেনির হত্যার প্রতিক্রিয়ায় কার্যকর হতে চাইছে।
কিছুটা দূরেই হয়েছে হামলা। বিকট বিস্ফোরণের পর উঠছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় ছুটছেন আতঙ্কিত মানুষজন। ৫ মার্চ ইরানের রাজধানী তেহরানে
গোপন পাল্টা হামলায় বাগদাদের দক্ষিণ ও নাসিরিয়া ও বসরার কাছাকাছি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটিতে ‘সুইসাইড ড্রোন’ হামলা হয়েছে। এতে ১৫ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন, যারা মূলত কাতায়েব হিজবুল্লাহর সদস্য।
ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে সক্রিয় হলেও হামাস ও হুতি এই সংঘাত থেকে দূরে রয়েছে।
মানসুর বলেন, ‘এটি পুরোপুরি টিকে থাকার লড়াই। টিকে থাকার হিসাব সব সময় ইরানের টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত থাকে না।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক ফিলিপ স্মিথ বলেন, হুতিদের ভবিষ্যতের জন্য রিজার্ভ রাখা হয়েছে। ইরানি শাসনপতনের পতন ঘটলে তারা বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দুর্বল করতে ইরাকের জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে প্রোক্সি ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে আইআরজিসির লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দায় স্বীকার করেছে নতুন গঠিত ‘আহওয়াজ ফ্যালকনস’ নামের গোষ্ঠী।
ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠী জোট ভারত মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। হিজবুল্লাহ ইরাক ও সাইপ্রাসে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তবে ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ ইসরায়েলি হামলার কারণে দুর্বল হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে আকস্মিক হামলার পর এই অবস্থা শুরু।
ফিলিস্তিনের হামাস ও ইয়েমেনের হুতি এখনও সংঘাত থেকে দূরে রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানের ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত