ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা এবং এর পাল্টা জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়ার মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ ইতিমধ্যেই এক সপ্তাহ অতিক্রম করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুপক্ষের চলমান হামলা ও পাল্টা হামলা পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের প্রাথমিক হিসাবকে অতিক্রম করেছে এবং সংঘাত এখন অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পথে প্রবাহিত হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে এই অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন, তবে সপ্তম দিনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ধ্বংস এবং এক অনুগত শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সামরিক অভিযান আরও কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ইরানের নেতৃত্বের অনমনীয়তা যুদ্ধের সময়সীমা দীর্ঘ করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেছেন, ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করতে হবে, নতুবা অভিযান চলবে। তেহরানের সামরিক কমান্ডও পাল্টা হুংকার দিয়েছে।
তারা জানিয়েছে, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা পিছু হটবে না। এই অবস্থান পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত স্থবিরতা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ থাকায় শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে গেছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধের তীব্রতা ও আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারে বৃদ্ধি:
এক সপ্তাহে হামলার তীব্রতা ও আধুনিক মারণাস্ত্রের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে, তারা প্রথমবারের মতো ইরানে বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে হামলা চালিয়েছে।
অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, তেহরানসহ অন্যান্য শহরের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক লঞ্চারকে লক্ষ্য করে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘পেনিট্রেটর’ বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা অভিযান দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। শুক্রবার ভোরে তেহরান, ইসফাহান ও ধর্মীয় নগরী কোমের শিল্প এলাকায় বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। তারা দাবি করেছে, অন্তত ৬টি ব্যালিস্টিক লঞ্চার এবং তিনটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
পাল্টা জবাবে ইরানও সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ‘নতুন প্রজন্মের’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দর বেনগুরিয়নে হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া হাইফা ও তেলআবিবেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলার পাশাপাশি একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লেগেছে।
ক্ষতি ও মানবিক প্রভাব:
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই জনজীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১,৩৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। মিনাব শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ১৭৫ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে ৩,৬৪৩টি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ৩,০৯০টি ব্যক্তিগত বাড়ি, ৫২৮টি বাণিজ্যিক ও সেবাকেন্দ্র, ১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র ও ৯টি রেড ক্রিসেন্টের নিজস্ব স্থাপনা।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ২১৭ জন নিহত ও ৭৯৮ জন আহত হয়েছেন। কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন ছয় সেনা নিহত হয়েছেন, এছাড়া স্থানীয় বাহিনীর দুই জনসহ আরো চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও ইরানের হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১ মার্চ বেইত শেমেশে ৯ জন মারা যান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজন, ওমানে একজন এবং বাহরাইনে একজন নিহত হয়েছেন। আবুধাবিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস হওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে পাকিস্তান ও নেপালের ছয় নাগরিক আহত হয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে বসবাসের ব্যাঘাতও বেড়েছে। প্রথম দুই দিনে তেহরান ছেড়েছে প্রায় ১ লাখ মানুষ। লেবাননে ৫৮ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে এবং সিরিয়ার সীমান্তে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলে যাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও নৌপথে প্রভাব:
হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরের জলপথ বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী এই জলপথ এখন কার্যত অবরুদ্ধ।
ফ্রান্সের পরিবহন মন্ত্রী ফিলিপ তাবারো জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরে ৫২টি এবং লোহিত সাগরে ৮টি ফরাসি জাহাজ আটকে আছে। চীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস বহনকারী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করেছে। এমিরেটস ও ইতিহাদ বিমান সংস্থাগুলোও বাণিজ্যিক ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কৌশলগত দ্বন্দ্ব:
যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি শাসনব্যবস্থার পতনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। তবে হোয়াইট হাউস ‘রেজিম চেঞ্জ’ বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করছে না। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রশাসনের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি

