ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে মাত্র এক সপ্তাহেই ব্যাপক রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (যুদ্ধের অষ্টম দিন) ইরানের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। ভোরে রাজধানী তেহরানের আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
এর জবাবে ইরানও ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা আঘাত হানে। তেল আবিবসহ উত্তর ও দক্ষিণ ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণ ও বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন শোনা যায়।
এই সংঘাতের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত আকার নিচ্ছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন হুতি ইতোমধ্যে ইরানের সমর্থনে যুদ্ধ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া লেবাননেও ইসরায়েলের হামলায় বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন। তবে ইরান সেই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন,
“শত্রুরা ইরানের আত্মসমর্পণের স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন তারা কবরে নিয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা না চালানো হয়, তাহলে ইরানও তাদের লক্ষ্য করে হামলা করবে না।
ইরান ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর ইসরায়েলের তেল আবিব ও নেগেভ মরুভূমির কাছে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে ইরান ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শনিবার পর্যন্ত ইরান অন্তত পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এসব হামলার কারণে সারারাত লাখ লাখ ইসরায়েলিকে আশ্রয়কেন্দ্র ও বাঙ্কারে অবস্থান করতে হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
এছাড়া বাহরাইনের জুফাইরে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান। বাহরাইনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার সময় সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতেও। ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে যুদ্ধের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের রাজধানী তেহরান ও ইসফাহানে বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ব্যাপক হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্টে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে অন্তত ৩০টি গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ১৯৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন এবং ৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংঘাতের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। রাশিয়া দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ২৮ হাজার নাগরিককে সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন মন্তব্য করেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, হিজবুল্লাহ ও হুতি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততায় এই যুদ্ধ দ্রুত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
যদি পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়—বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

