মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছে চীন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। একই সঙ্গে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
রোববার (৮ মার্চ) বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়াং ই বলেন, বর্তমান সংকটের সমাধান সামরিক শক্তি দিয়ে কখনোই সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংঘাতের পথ ছেড়ে কূটনৈতিক আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ওয়াং ই বলেন, বিশ্ব আবার এমন এক পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে পারে না যেখানে শক্তিশালীরাই সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়।
তার ভাষায়,
“সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্বকে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ধরনের শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।”
তিনি মনে করেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সংলাপের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বক্তব্যেরও কড়া সমালোচনা করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ওয়াং ই বলেন, ইরানে তথাকথিত ‘রঙিন বিপ্লব’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টার প্রতি দেশটির জনগণের কোনো সমর্থন নেই। তাই বাইরের শক্তির মাধ্যমে এমন পরিবর্তনের চেষ্টা করা উচিত নয়।
তার মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রশ্নটি সম্পূর্ণভাবে সেই দেশের জনগণের বিষয়।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ইরানসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানান। তার মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে শুধু সংঘাতই বাড়বে না, বরং এটি অন্য অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
ওয়াং ই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান সংঘাত এমন একটি যুদ্ধ যা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না।
তিনি বলেন,
“এই যুদ্ধ কারও কোনো উপকার করছে না। শক্তি কখনোই সমাধান দেয় না। সশস্ত্র সংঘাত কেবল ঘৃণা বাড়ায় এবং নতুন সংকট তৈরি করে।”
তার মতে, সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ওয়াং ই আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জনগণই এই অঞ্চলের প্রকৃত মালিক।
তাই এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও তাদেরই থাকা উচিত। বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেই নিজেদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স কাউন্সিল–এর একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক হামলা চালালেও ইরানের সামরিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার কাঠামো সহজে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
এই মূল্যায়ন মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওয়াং ই সব পক্ষকে দ্রুত সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, মতপার্থক্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কূটনৈতিক আলোচনা। এর মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা এবং যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
চীন ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
এর আগে গত বুধবার (৪ মার্চ) ওয়াং ই জানিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত মোকাবিলায় চীন একজন বিশেষ দূত পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, চীন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত, যাতে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়, মানুষের শান্তি নিশ্চিত করা যায় এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।

