মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত বাড়ছে তেলের দাম, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এক ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮.৭৭ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলেই বাজারে দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল। সেই সময়ের পর এবারই একদিনে তেলের দামে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা গেল। এর আগে গত সপ্তাহেই তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল, যা বাজারে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করায় বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহ কিংবা মাসজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে বিভিন্ন দেশকে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে সরবরাহকারীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ অবস্থায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগর অঞ্চল থেকে তেলের চালান বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে শিপিং সংক্রান্ত তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালির সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণ করার জন্য এই সরবরাহ যথেষ্ট নাও হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এএনজেড ব্যাংকের সিনিয়র পণ্য কৌশলবিদ ড্যানিয়েল হাইন্স জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকদের গুদামে তেল জমে যাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন কমানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিও তেলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ।
তার মতে, যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তেলের কূপ বন্ধ করতে হয়, তাহলে শুধু উৎপাদনই কমবে না, বরং সংঘাত শেষ হওয়ার পরও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে।
জেপিমরগানের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রুস কাসমান বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর এই সরবরাহের একটি বড় অংশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পৌঁছে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। পরে সংঘাত কিছুটা কমে এলে দাম আবার কিছুটা কমতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, স্পষ্ট এবং কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান না হলে বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারের কাছাকাছি উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে।
ব্রুস কাসমান আরও বলেন, এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তার মতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
একই সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারেরও বেশি হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি যদি দ্রুত স্থিতিশীল না হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম এবং অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

