এম এস রহমান, পাবনা প্রতিবেদক—
এবারের ঈদের ছুটিতে বাহরাইন থেকে দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার কথা ছিল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার যুবক আরিফুর রহমান আরিফের। রমজানের মাঝামাঝি সময়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে বাহরাইনে সব ফ্লাইট বন্ধ থাকায় দেশে ফিরতে পারছেন না তিনি।
আরিফুর রহমানের মতো একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন বাহরাইনের পানামা বিমানবন্দরের সন্নিকটে ‘হিদ’ শহরের অভিজাত ‘ডিআর হিদ গ্রিল’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে কর্মরত পাবনার ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও নাটোরের লালপুর উপজেলার আরও ১৩ জন বাংলাদেশি।
তাদের দিন-রাতের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে বিমানবন্দরের উচ্চ শব্দের সাইরেন, ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের বিকট শব্দ, মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপের মতো প্রাণঘাতী আতঙ্কে। তাদের নিয়ে সীমাহীন উদ্বেগ, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন স্বজনরা।
‘ডিআর হিদ গ্রিল’ রেস্টুরেন্টে কর্মরত পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের ঢুলটি দেবীপুর গ্রামের আরিফুর রহমান আরিফ, সাঁড়া ইউনিয়নের মাজদিয়া গ্রামের মাদ্রাসাপাড়ার অন্তর হোসেন ও রফিকুল ইসলাম, একই ইউনিয়নের ইলশামারী গ্রামের বকুল হোসেন, আটঘরিয়া উপজেলার চঞ্চল হোসেন ও আসাব আলী, নাটোরের লালপুর উপজেলার আনোয়ার হোসেন, মোজাম্মেল হক ও হাবিবুর রহমানসহ ১৩ জন প্রবাসী বাংলাদেশির সবারই দিন ও রাত এখন সমান উৎকণ্ঠায় কাটছে।
মুঠোফোনে সিটিজেনস ভয়েসের প্রতিবেদক এম এস রহমানের সঙ্গে রোববার যোগাযোগ হয় আরিফুর রহমানের। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ভোর সাড়ে চারটার সময় আমাদের রেস্টুরেন্টের সামনে খুব কাছেই আকাশে বিকট শব্দে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হয়। এ সময় আমরা ভেবেছিলাম, আজই বোধহয় আমাদের জীবনের শেষ দিন। বিমানবন্দরের বিকট সাইরেনের শব্দ ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণে প্রতি মুহূর্ত আমরা সবাই চরম আতঙ্কে আছি।
তিনি আরও বলেন, একদিন আগে এখান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে সালমানিয়া আসরি শিপে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। ২০১৪ সালে আমরা বাহরাইনে এসেছি। গত ১২ বছরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হইনি।
একই স্থানে অবস্থান করা ঈশ্বরদীর মাজদিয়া গ্রামের যুবক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিমানবন্দরের খুব কাছেই আমাদের কর্মস্থল। কর্মস্থলেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দিন-রাত সবসময়ই আমাদের এখানে থাকতে হয়। প্রতিমুহূর্তে বিমানবন্দরের সাইরেন ও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দে আমাদের মানসিক অবস্থা এখন বিপর্যস্ত। একদিকে এখানে আমরা সবসময় প্রাণসংকটে আতঙ্কে আছি, অন্যদিকে দেশে আমাদের পরিবার-পরিজনও আমাদের নিয়ে অজানা আশঙ্কায় রয়েছেন।
একই স্থানে থাকা আটঘরিয়া উপজেলার চঞ্চল হোসেন বলেন, এখানকার সরকার আমাদের সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু আকাশ থেকে উড়ে আসা মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র যদি আমাদের রেস্টুরেন্টের ওপর পড়ে, তাহলে হয়তো আমাদের কারোরই আর জীবন নিয়ে দেশে ফেরা হবে না। সবসময় এই আতঙ্কেই আছি।
এদিকে বিদেশে থাকা প্রবাসীদের নিয়ে দেশে স্বজনদের মাঝেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঈশ্বরদীর মুলাডুলি ইউনিয়নের ঢুলটি দেবীপুর গ্রামের আরিফুর রহমানের ছেলে হামিম সরকার বলেন, কয়েক বছর বাবার সঙ্গে ঈদ করা হয়নি। এবার বাবা দেশে আসবেন—এই অপেক্ষায় আমরা ছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাহরাইনে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় ঈদের আগে বাবার দেশে ফেরা হচ্ছে না। একই সঙ্গে সেখানে বাবা ও তাঁর সহকর্মীরা প্রাণসংকটে থাকায় আমরাও সব সময় আতঙ্কে রয়েছি।

