উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি৭।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)-এর সমন্বয়ে গঠিত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা এসপিআর থেকে তেল ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে জি৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা জরুরি আলোচনায় বসবেন। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্র জানায়, জি৭ অর্থমন্ত্রীদের সঙ্গে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফতিহ বিরল নিউইয়র্ক সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে এবং বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে টেলিফোন বৈঠকে অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ জি৭ জোটের অন্তত তিনটি দেশ কৌশলগত মজুদ থেকে জ্বালানি তেল ছাড়ার ধারণাকে সমর্থন জানিয়েছে। আইইএর ৩২টি সদস্য দেশ যৌথ জরুরি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এ মজুদ ধরে রাখে। মূল উদ্দেশ্য হলো, জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগলে দ্রুত সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে আনা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে যৌথভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়াই যথেষ্ট হতে পারে। আইইএ দেশগুলোর সরকারি মজুদ প্রায় ১২৪ কোটি ব্যারেল। সে হিসাবে সম্ভাব্য এই ছাড় মোট মজুদের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের সমান। এমন সময়ে আলোচনাটি হচ্ছে যখন উপসাগরীয় সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গড় পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ২ ডলার ৯৮ সেন্ট থেকে বেড়ে ৩ ডলার ৪৫ সেন্টে পৌঁছেছে। বাজারে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে।
গত এক সপ্তাহে জ্বালানি তেলের এই ঊর্ধ্বগতির ফলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বের বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন। ফলে দাম বাড়ার ধাক্কায় এসব অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুড এশিয়ার লেনদেনে এক পর্যায়ে ২৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৭১ সেন্টে পৌঁছায়। তবে জি৭-এর সম্ভাব্য বৈঠকের খবর প্রকাশের পর দাম কিছুটা কমে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ১১০ ডলার ৮৫ সেন্টে দাঁড়ায়। অন্যদিকে মার্কিন মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) প্রথমে ২৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৪৫ সেন্টে ওঠে। পরে তা কমে প্রায় ১০৮ ডলারে নেমে আসে, যা এখনও আগের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।
জরুরি জ্বালানি মজুদ ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৭৪ সালে, আইইএ প্রতিষ্ঠার সময়। এর পেছনে ছিল ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের অভিজ্ঞতা। সে সময় ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং পশ্চিমা বিশ্বে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়।
এসপিআর ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো, বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের সময় প্রধান ভোক্তা দেশগুলোকে দ্রুত বাজারে তেল সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া। আইইএ গঠনের পর থেকে সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে পাঁচবার কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সর্বশেষ দুইবার এই পদক্ষেপ নেওয়া হয় ২০২২ সালে, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে।
সম্প্রতি আইইএ একটি জরুরি বৈঠকে সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহ সংকট মোকাবিলার বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করেছে। বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা একটি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইইএ প্রস্তুত রয়েছে।
গোপন ওই নথি অনুযায়ী, আইইএ সদস্য দেশগুলোর সরকারি মজুদ ১২৪ কোটি ব্যারেলের বেশি। এর বাইরে শিল্প খাতেও প্রায় ৬০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল রয়েছে, যা প্রয়োজনে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই মজুদ আইইএ দেশগুলোর মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক মাসের সমান। আর নিট আমদানির হিসেবে এটি ১৪০ দিনের বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। মজুদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অংশ প্রায় ৭০ কোটি ব্যারেল, যা মোটের অর্ধেকেরও বেশি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু রিপাবলিকান নেতা সমালোচনা করে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসন পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জ্বালানি তেলের দাম বাড়া নিয়ে উদ্বেগকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তিনি লেখেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হলে স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি সামান্য মূল্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ফিউচার সূচকের ইঙ্গিত অনুযায়ী, মার্কিন শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে চাপ আরও বাড়াতে পারে।
এসপিআর ব্যবহারের বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। কারণ গত সপ্তাহেই বলা হয়েছিল, বাজার স্থিতিশীল রাখতে কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার প্রয়োজন হবে না। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দিনে দামের নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে বাজার স্থিতিশীল রাখতে এ পদক্ষেপ প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিকারকেরা কয়েক দিনের মধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন আইইএর পূর্ণ সদস্য না হলেও দেশটির নিজস্ব বড় জ্বালানি মজুদ রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, গত এক বছরে চীন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল মজুদ করেছে। বর্তমানে বেইজিংয়ের কাছে প্রায় ১১০ থেকে ১৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল থাকতে পারে, যা দেশটির আমদানির চাহিদা প্রায় ১৪০ দিন পর্যন্ত পূরণ করতে সক্ষম।

