মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেও বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ জোরদার করেছে। এর অংশ হিসেবে ইরান আশ্বাস দিয়েছে যে বাংলাদেশের জন্য তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, তাই আগাম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরান বাংলাদেশের অনুরোধে সম্মতি জানিয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে তাদের তথ্য জানাতে হবে। এতে করে জাহাজ চলাচল সহজ হবে এবং কোনো ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। এ আশ্বাস পাওয়ার ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সোমবার (১০ মার্চ) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদীর এক বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বাংলাদেশ তার জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে। সে ক্ষেত্রে জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে ঢোকার আগে তথ্য জানালে তা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
এদিকে দেশের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া চলতি সপ্তাহের মধ্যেই আরও চারটি জাহাজে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল দেশে আসার কথা রয়েছে।
সরকার এপ্রিল মাসের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎস থেকেও তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন এড়াতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে।
স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তবে বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টন সরবরাহ করছে। এভাবে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আসন্ন পাঁচটি চালানে আসা ১ লাখ ৪৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি দিয়ে প্রায় ১৬ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারত ও চীনও সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন দেশের সহায়তা চাইছে এবং এতে সংকট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে এর বড় অংশ সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সরবরাহও নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টন করে ডিজেল থাকবে, যা দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
সরকার একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধেও পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দেশের সব জেলা প্রশাসককে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে।
বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুমে সেচের জন্য কৃষকদের জ্বালানি সরবরাহে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

