মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, আর এই কৌশলগত নৌপথটি বর্তমানে গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গত মাসের শেষে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে তেলের প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে আকাশছোঁয়া পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, তেলের দাম কমাতে তিনি কিছু দেশের ওপর আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পরিকল্পনা করছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, “তেলের দাম কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমরা কিছু নিষেধাজ্ঞা বাতিল করছি।”
একই সঙ্গে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নামও উল্লেখ করেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে সমন্বয়ের অংশ হতে পারে।
তবে ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে কিংবা কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে—সেসব বিষয়েও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, যেসব দেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে, তাদের মধ্যে রাশিয়ার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। কারণ রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ। পাশাপাশি চীন রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক বাজার।
এদিকে ট্রাম্প আরও বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিছু দেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হতে পারে। এমনকি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সেগুলো পুনরায় আরোপ না করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “তারপর কী হবে কে জানে? হয়তো আর সেই নিষেধাজ্ঞাগুলো আরোপের প্রয়োজনই পড়বে না। তখন বিশ্বজুড়ে আরও বেশি শান্তি থাকতে পারে।”
পাশাপাশি ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তেলবাহী জাহাজগুলোকে সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দেন যে, রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি ওয়াশিংটনের বিবেচনায় রয়েছে।
এর একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সাময়িকভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অনুমতি দেয়। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নানা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তখন মিত্র দেশগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য থেকে বিরত থাকতে চাপও দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
তবে বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সেই নীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ভারতকে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে রুশ তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভোটারদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন মিডটার্ম নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে করে অনেক দেশ বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, ইরান ও ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাশিয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীনের মতো বড় বাজারে রাশিয়া এখন তেল রপ্তানি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকে, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তখন তেলের দাম শুধু বাড়বে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।

