ইরানের বিরুদ্ধে চলমান হামলা নিয়ে ইসরাইলের ভেতরেই উদ্বেগ দেখা দিতে শুরু করেছে। দেশটির কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র ইসরাইলি কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে হামলা বন্ধ করা হবে নাকি আরও জোরদার করা হবে— সেই সিদ্ধান্ত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রাম্প এখনো পুরোপুরি সামরিক বিজয় অর্জনের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। যদিও বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। প্রথমদিকে ট্রাম্প ইরান সরকারের তুলনামূলক নমনীয় সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি আবার ইরানের কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, ইসরাইল এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা তিনি ‘মোমেন্ট অব ট্রুথ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের পর। রোববার ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে, যিনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ছেলে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি কট্টরপন্থী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার সম্ভাবনা আরও কমে যেতে পারে।
তবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মহলের কিছু অংশ ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য সংকট— এসব বিষয় নিয়ে তারা চিন্তিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, “শাসন উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সত্যিই আমাদের স্বার্থে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। কেউই অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধের ময়দানে থাকতে চায় না।”
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলা ইতোমধ্যে অনেক সামরিক লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর কিছু শীর্ষ নেতৃত্ব ইতোমধ্যে বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, ইসরাইল অবশ্যই ইরানের শাসন পরিবর্তন দেখতে চায়, তবে সেটিই যুদ্ধ শেষ হওয়ার একমাত্র উপায় নয়। প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে ইসরাইল নিজেদের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে বলে মনে করতে পারে।
তবে তিনি এটাও মনে করেন, ইরান সরাসরি আত্মসমর্পণ করবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত শর্তে যুদ্ধবিরতি মানার ইঙ্গিত দিতে পারে।
অন্যদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের সামনে আরও কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এর একটি হলো লেবাননে বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু হওয়ার ঝুঁকি। বর্তমানে হিজবুল্লাহর অবশিষ্ট শক্তি ধ্বংস করতে সীমান্তবর্তী এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করলেও বড় আকারের স্থল অভিযানের পরিকল্পনা নেই বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
তিনি আরও বলেন, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি। মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অন্তহীন যুদ্ধে টেনে আনতে চাই না। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বোঝা নয়, বরং একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র।”
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করে একটি নতুন ইরান গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তার কাছে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে একটি বড় প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে— এই যুদ্ধ শেষ হবে কীভাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব গভীর হতে পারে।

