ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের শহর টাইর, যা আরবিতে সুর নামে পরিচিত, সেখানে ইসরায়েলের দুটি বিমান হামলা হয়। এর কিছুক্ষণ আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে টাইর ও সিদন শহরে হামলার হুমকি দিয়ে বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, বাসিন্দাদের অন্তত ৩০০ মিটার দূরে সরে যেতে হবে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। এরপর থেকে পূর্ব লেবাননে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল লেবাননের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি রাজধানী বৈরুতেও হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের জাহরানি এলাকা থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জেইনা খোদর বলেন, দক্ষিণ লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চলছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সীমান্ত ও লেবাননের ভেতরের এলাকাগুলোতে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়ে একটি নিরাপত্তা বলয় সম্প্রসারণ করতে চায় ইসরায়েল। তবে হিজবুল্লাহ বলছে, তারা এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দিক থেকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করেছে।
মঙ্গলবার ভোরে লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান আলমাজাদেল, চাকরা, স্রিফা এবং বেকা উপত্যকার কয়েকটি শহরে রাতভর হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া আনসারিয়া শহরের কাছে, বিনত জবেইল ও আইনাথা এলাকার আশপাশেও ব্যাপক হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিনত জবেইল জেলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, টাইর জেলার মাজদাল ও নাবাতিয়েহ জেলার কাফর সাসির শহরেও ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। এদিকে লেবাননের গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের কুলাইয়া গ্রামে ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় মারোনাইট ক্যাথলিক ধর্মযাজক ফাদার পিয়েরে আল-রাহি নিহত হয়েছেন।
লেবাননের দৈনিক ল’ওরিয়ঁ লে জুর জানিয়েছে, একটি স্থানীয় দম্পতির বাড়িতে দ্বিতীয়বার ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপ করলে সেখানে সাহায্য করতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে ওই ধর্মযাজকও আহত হন। পরে তিনি মারা যান।
কুলাইয়া গ্রামের কাউন্সিল প্রধান হান্না দাহের বলেন, “আমরা অল্পের জন্য বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে গেছি, কারণ সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল। তবু কয়েকজন আহত হন, তাদের মধ্যে পিয়েরে আল-রাহিও ছিলেন, পরে তিনি মারা যান।”
মৃত্যুর একদিন আগে কুলাইয়ার গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে ফ্রান্স চব্বিশ টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-রাহি বলেছিলেন, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে গ্রাম রক্ষায় সেখানেই থাকবেন।
তিনি বলেন, “ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমরা এখানে থাকতে বাধ্য। আমরা আমাদের ভূমি রক্ষা করছি এবং তা করছি শান্তিপূর্ণভাবে। আমাদের কারও হাতে অস্ত্র নেই। আমরা সবাই শান্তি, কল্যাণ ও ভালোবাসা বহন করছি।”
এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে তারা লেবাননে আল-কর্দ আল-হাসান নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৩০টি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, এই প্রতিষ্ঠানটি হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরেও এই প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছিল, এই হামলাগুলো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত, কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখাগুলো সাধারণত বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হয়, যদি না সেগুলো সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকায় হিজবুল্লাহও পাল্টা আক্রমণ বাড়িয়েছে। ইসরায়েলের জাতীয় জরুরি চিকিৎসা সংস্থা জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্য ইসরায়েলে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন।
হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা সাফাদ শহরের পূর্বে গিভা ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং সীমান্তের কাছে ইয়িফতাহ ব্যারাকেও রকেট নিক্ষেপ করেছে।
এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর একাধিক হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। তাদের দাবি, খিয়াম শহরের উপকণ্ঠে তারা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তিনটি মেরকাভা ট্যাংকে আঘাত করেছে এবং সেগুলোতে আগুন ধরে যায়।
সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস উভয় পক্ষকে তাদের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দেশটিকে বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়া যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে, যেখানে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও উপস্থিত ছিলেন, কালাস হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সব ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।0তবে তিনি ইসরায়েলের কঠোর পাল্টা আক্রমণের সমালোচনাও করেন। তার মতে, এসব হামলার ফলে ব্যাপক মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটছে এবং ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, “ইসরায়েলকে লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।” তার সতর্কবার্তা, এতে লেবানন ও দেশটির জনগণ এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তাদের নয় এবং যার মানবিক পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
অন্যদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সোমবার হিজবুল্লাহকে রাষ্ট্রের পতনের দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য বৈরুতের প্রস্তুতির কথাও জানান।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সোমবার থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮৬ জন নিহত হয়েছেন।
সূত্র: আল জাজিরা

