ইরানে যুদ্ধ বাধানের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এক জটিল সমীকরণের সামনে পড়েছে, যার একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, অন্যদিকে নৌ অভিযানে বিপর্যয়ের ঝুঁকি।
সিএনএন এক প্রতিবেদনে লিখেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ ধমনী সঙ্কুচিত হয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘নন-লিনিয়ারিটি’। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি যতদিন বন্ধ থাকবে, অর্থনৈতিক চাপ শুধু দ্বিগুণ হবে না, বহুগুণে বাড়ত থাকবে।
বিশ্ব বাজারে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক দিক থেকে চেষ্টা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল শুরু করতে জটিল সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সেই সঙ্গে বাজারে হস্তক্ষেপ করে জ্বালানির দাম কমানোর উপায় খোঁজা হচ্ছে। জনসাধারণকে আশ্বস্ত করতে একটি প্রচারও শুরু হয়েছে; তাদের বোঝানো হচ্ছে, পেট্রোল পাম্পে যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা হয়ত দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
কিন্তু পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের ভেতরে হিসাব-নিকাশ ক্রমেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সোমবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনার কথা শোনানোর পর তা ৯০ ডলারে নেমেছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের ওই কথায় ভরসা রাখতে পারছেন না।
বিশ্ব বাজারে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শোধনাগরে আর তেল রাখার জায়গা হচ্ছে না। এ অবস্থা চললে মধ্যপ্রাচ্যের বড় কোম্পানিগুলো তেল উত্তোলন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।

কুয়েত, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে সংরক্ষণ ট্যাংক পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কিছু তেলকূপ বন্ধ করে দিয়েছে। একবার এসব কূপ বন্ধ হয়ে গেলে সহজে আবার চালু করা যায় না। ফলে সামনে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হবে নতুন আঘাত।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, “বাজারের এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা আরও খারাপ হয়, তাহলে এই যুদ্ধের পরিধি ও মাত্রা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হতে হবে সরকার। স্বল্পমেয়াদে কোনো একটা সমাধান এখন জরুরি, আর হোয়াইট হাউস তা ভালো করেই জানে।”
তেল কোম্পানির কর্মকর্তা, বাজার বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মতে, দ্রুত অবনতি হতে থাকা এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার তাৎক্ষণিক একটি সমাধান হতে পারে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘এসকর্ট’ অভিযান। এর মানে হল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব তেলবাহী জাহাজ যাবে, সেগুলোকে নিরাপত্তা দেবে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও গত সপ্তাহে এরকম একটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন লিখেছে, হরমুজে এসকর্ট অভিযান কীভাবে সম্ভব, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখছেন মার্কিন সামরিক বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ধরনের পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে একটি পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা চলছে।
মার্কিন নৌ অভিযান কবে শুরু হবে, কীভাবে তা চলবে–এসব বিষয় নিয়ে গত সপ্তাহে প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আর সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানোর ঝুঁকি মূল্যায়ন।

‘ডেথ ভ্যালি’
একজন মার্কিন কর্মকর্তা হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হিসেবে।
মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ যদিও প্রস্তুত রয়েছে, তবু হরমুজের কৌশলগত বাস্তবতা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ইরান এ প্রণালিকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করেছে—একদিকে তাদের নৌবাহিনী, অন্যদিকে আরো আক্রমণাত্মক ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
এই বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর হাতে রয়েছে মাইন পাতা নৌযান, বিস্ফোরকভর্তি আত্মঘাতী বোট এবং উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা।
একজন মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সিএনএন লিখেছে, “আমরা যদি তাদের সক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে চাই, তার আগেই তেলের দামের চাপ চরমে পৌঁছে যাবে।”
বর্তমানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো হরজুম প্রণালির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সংকীর্ণ পথগুলো এড়িয়ে চলছে। এসব যুদ্ধজাহাজ যদিও ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু তেলবাহী জাহাজকে সুরক্ষা দিতে এসকর্ট মিশনে গেলে নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে যেতে হবে, যেখানে যুদ্ধের কৌশলগত সুবিধা তেমন নেই।
সাধারণ পরিকল্পনা হল, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো তেলবাহী ট্যাংকারকে ইরানি হুমকি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার মত অবস্থানে থাকবে এবং লিটোরাল কমব্যাট শিপগুলো (এলসিএস) পাহারা দেবে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরান এখানে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল খাটাতে পারে। উপসাগরে ঢোকার সময় তারা জাহাজে হামলা করবে-তেমন সম্ভাবনা কম; বরং বের হওয়ার সময়, যখন সেগুলো পুরোপুরি তেলবোঝাই থাকবে, তখনই হামলার আশঙ্কা বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ‘শক ভ্যালু’ বা সর্বোচ্চ প্রভাব তৈরির চেষ্টা করতে পারে, যা হবে আরো উদ্বেগজনক। ইরান প্রথমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজে হামলা করতে পারে, যেগুলো বৈরুত বিস্ফোরণের মত ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এরপর তারা তেলবাহী ট্যাংকার নিশানা করতে পারে, যাতে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব হবে সর্বোচ্চ।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি সোমবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের অনড় অবস্থান তুলে ধরে ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এসকর্ট মিশন চালিয়ে হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। এর জবাবে লারিজানি এক্সে লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধের আগুন এই অঞ্চলে জ্বালিয়েছে, তার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে কোনো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে—তেমনটা মনে হয় না।”
মার্কিন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি সিএনএনকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা যদি একযোগে হঠাৎ করে প্রণালির আশপাশে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে, তাহলে তা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইংগিত। তখন বুঝতে হবে, মার্কিন নৌ এসকর্ট অভিযান পরিকল্পনার স্তর পেরিয়ে বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সিএনএন লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তাদের উপসাগরীয় অংশীদারদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে, যার মধ্যে ইরানি নৌঘাঁটিগুলোও রয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলা শুরু হলে তা এসকর্ট অভিযানের স্পষ্ট পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অন্য বিকল্পগুলো
মার্কিন সামরিক বাহিনী যখন ইরানের প্রতিরক্ষা অবস্থান আরও দুর্বল করার চেষ্টায় পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন তখন বাজার স্থিতিশীল করতে অন্য বিকল্পগুলোও ওজন করে দেখছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আপাতত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার করছেন। তারা বলতে চাইছেন, জ্বালানি বাজারের বর্তমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা কমে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে ‘আরও স্থিতিশীল’ অবস্থায় নিয়ে যাবে।
রোববার সিবিএসের ‘ফেইস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, “আমরা সাময়িকভাবে জ্বালানির উচ্চ দামের একটি পর্যায় পার করছি, তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও এটা কয়েক সপ্তাহের বিষয়, মাসের নয়। শেষ পর্যন্ত এটা আমাদের আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে।”

সিএনএন লিখেছে, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে আলোচনাও করেছেন। পাশাপাশি হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করতে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদ ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ ব্যবহার করার কোনো পরিকল্পনা হোয়াইট হাউস এখনও করছে না।
সোমবার তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর জি–৭ দেশগুলো কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেও আপাতত সে সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এদিকে উদ্বিগ্ন জাহাজমালিকরা যাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চালানোর সাহস পান, সেজন্য ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্বীমা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সমুদ্রে ভাসমান জাহাজে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ রুশ তেল বাজারে ছাড়ার একটি সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
এছাড়া ভেনেজুয়েলায় এখন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকার। সেখানেও তেল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।

সিএনএন লিখেছে, ট্রাম্পের জন্য এই সংকট শুধু ভূরাজনীতির বিষয় নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টিকে থাকারও বিষয়।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এমন এক রাজনৈতিক হুমকি তৈরি করতে পারে, যা কূটনৈতিক বক্তব্য দিয়ে ঢেকে রাখা কঠিন।
একটি তেল কোম্পানির কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত হরমুজ প্রণালিকে আবার নিরাপদ করা।
মার্কিন নৌবাহিনী যতক্ষণ না নিশ্চিত করতে পারছে যে তেলবাহী জাহাজগুলো ভাসমান নরককুণ্ডে পরিণত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত ওই জলপথ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে কার্যত জিম্মি করে রাখবে।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪

