যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার থেকে বিভিন্ন সময়ে হারিয়ে যাওয়া ছয়টি শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা নিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্কিন সামরিক পরিভাষায় এসব ঘটনাকে বলা হয় ‘ব্রোকেন অ্যারো’—যার অর্থ পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত দুর্ঘটনা।
মার্কিন সামরিক নথি অনুযায়ী, এ ধরনের মোট ৩২টি ঘটনা নথিভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি পারমাণবিক বোমার হদিস আজও পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মৃত্যু ও ধ্বংসের’ হুমকি ঘিরে এই হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো আবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনোভাবে যদি এসব অস্ত্র শত্রুরাষ্ট্রের হাতে পড়ে, তবে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি পারমাণবিক হামলার জন্য প্রস্তুত বিশেষ বিমান ‘ডুমসডে প্লেন’ ইরানের দিকে পাঠিয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। বোয়িং ৭০৭ এয়ারফ্রেমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই বিমানগুলো মূলত পারমাণবিক হামলা পরিচালনা ও আকাশ থেকে পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো—যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এসব বোমার অবস্থান খুঁজে পায়নি, তাই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরাও সহজে তা খুঁজে পাবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রের তলদেশ বা দুর্গম স্থানে পড়ে থাকা এসব মারণাস্ত্র যদি কোনোভাবে উদ্ধার করা যায়, তবে তা একটি বড় শহর ধ্বংস করার মতো ভয়াবহ শক্তি বহন করে।
নিখোঁজ অস্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৫৮ সালে টাইবি দ্বীপের কাছে। সে সময় একটি বি-৪৭ হাইড্রোজেন বোমারু বিমান মাঝ আকাশে অন্য একটি বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিমানটি তার কাছে থাকা ‘মার্ক-১৫’ হাইড্রোজেন বোমা সাগরে ফেলে দেয়।
প্রথমে এটিকে একটি নকল বা প্রশিক্ষণ বোমা বলা হলেও পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এটি আসলে পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হলেও আজ পর্যন্ত সেই বোমার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শুধু এই ঘটনাই নয়, গত কয়েক দশকে আরও পাঁচটি পারমাণবিক বোমা সমুদ্রের গভীর গহ্বর বা দুর্গম এলাকায় হারিয়ে গেছে। সেগুলোও আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে এই হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো রাষ্ট্র সমুদ্রের গভীরে অনুসন্ধান চালায় এবং এসব অস্ত্রের নাগাল পায়, তবে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এর মধ্যে টাইবি দ্বীপের কাছে হারিয়ে যাওয়া বোমাটির অবস্থান নিয়ে এখন আর তেমন অনুসন্ধানও চলছে না। ফলে সেটি কোথায় আছে তা এখনও অজানা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পেন্টাগনকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন এবং হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের অনিশ্চয়তা—এই দুই পরিস্থিতি মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, পুরনো ‘ব্রোকেন অ্যারো’ ঘটনাগুলো কেবল ইতিহাস নয়; এগুলো আজও বাস্তব এবং সম্ভাব্য হুমকি। যতদিন পর্যন্ত এই ছয়টি পারমাণবিক বোমার সঠিক অবস্থান নিশ্চিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত এগুলো অজানা ঝুঁকি হিসেবেই থেকে যাবে।

