মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন করিডোর হরমুজ প্রণালিতে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, পৃথক তিনটি জাহাজ অজ্ঞাত বস্তু বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজে আগুন লেগে যায় এবং ক্রুদের উদ্ধার করতে হয় ওমানের নৌবাহিনীকে।
হামলার ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময়, যখন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা প্রতিহত করার কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। ফলে এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে।
হামলার ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওমান উপকূল থেকে প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘ময়ূরী নারি’ নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভিডিও ফুটেজে জাহাজ থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। জাহাজটির ক্রুদের দ্রুত উদ্ধার করে ওমানের নৌবাহিনী।
এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে জাপানের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘ওয়ান মেজেস্টি’ একই ধরনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং জাহাজটি নিরাপদে নোঙর করার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ ছাড়া দুবাইয়ের উত্তর-পশ্চিমে আরও একটি বাল্ক ক্যারিয়ার হামলার শিকার হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (UKMTO) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ১৪টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ—সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার—এই নৌপথ ব্যবহার করে তাদের তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠায়।
এই কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা অচল হয়ে পড়া মানেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা। ইতোমধ্যে বাজারে সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হঠাৎ করে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ইউরোপীয় গ্যাসের বেঞ্চমার্ক মূল্য প্রায় ৫.৭ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শুধু তেলের দামই নয়, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি বিমা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সামরিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা
এদিকে হরমুজ সংকটের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান নামের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানানো হয়েছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা একটি তেলক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া পাঁচটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে।
জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা গবেষক ক্রিশ্চিয়ান বুয়েগার বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে এবং ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, “আজ যদি প্রণালিটি খুলেও দেওয়া হয়, তবুও সেখানে জাহাজের দীর্ঘ সারি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।”
যুদ্ধের মানবিক মূল্য
চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
অন্যদিকে পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৫০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে বড় প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। যদি হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তেলের দাম নতুন রেকর্ডে পৌঁছাতে পারে এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিও বাড়তে পারে।
এই কারণেই অনেক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি কেবল একটি যুদ্ধ নয়—বরং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

