এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে ধর্ষণ ও গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সদে তেইমান কারাগার–এ আটক এক ফিলিস্তিনি বন্দীর ওপর গণধর্ষণের অভিযোগে পাঁচজন সেনাকে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে পরে ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই অভিযোগগুলো আর বহাল রাখা হচ্ছে না।
২০২৪ সালের আগস্টে ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল ১২ ফাঁস হওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে একদল সৈন্য একজন ফিলিস্তিনি বন্দীকে ঘিরে ধরে নির্যাতন করছে এবং চারপাশে মানবিক দেয়াল তৈরি করে ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রকে তার শত্রুদের খুঁজে বের করতে হবে, নিজেদের বীর যোদ্ধাদের নয়।’
তদন্তে ব্যবহৃত ফুটেজের কিছু অংশে দেখা যায়, সৈন্যরা আটক ব্যক্তিকে ঘিরে রেখেছে এবং তাকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরা হয়েছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মেঝেতে পড়ে আছেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ফিলিস্তিনি বন্দীকে “ফেটে যাওয়া অন্ত্র, মলদ্বারে গুরুতর আঘাত, ফুসফুসে ক্ষতি এবং ভাঙা পাঁজর” নিয়ে সদে তেইমানের একটি ফিল্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
মূল অভিযোগে বলা হয়, প্রায় ১৫ মিনিট ধরে অভিযুক্তরা আটক ব্যক্তিকে লাথি মেরেছিল, তার ওপর পা দিয়ে চাপ দিয়েছিল, শরীরের ওপর দাঁড়িয়েছিল, লাঠি দিয়ে আঘাত করেছিল, মাটিতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল এবং তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে টেজার বন্দুক ব্যবহার করেছিল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষদিকে সদে তেইমান কারাগারে বন্দীদের পাহারার দায়িত্বে থাকা ‘ফোর্স ১০০’ ইউনিটের অন্তত নয়জন ইসরায়েলি সেনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। ঘটনাটি ইসরায়েলজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।
আটক ব্যক্তির ওপর গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত পাঁচজন সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, যদিও ধর্ষণের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, একজন সেনা ধারালো বস্তু দিয়ে আটক ব্যক্তিকে আঘাত করে, যার ফলে তার মলদ্বারের কাছে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়।
চ্যানেল ১২–এর তথ্য অনুযায়ী, মামলার সন্দেহভাজনদের পলিগ্রাফ পরীক্ষায় মিথ্যা বলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
দুজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তল্লাশির সময় তারা কি ফিলিস্তিনি বন্দীর মলদ্বারে কোনো বস্তু প্রবেশ করিয়েছিল এবং এ ধরনের কাজ করা ব্যক্তির পরিচয় গোপন করছে কি না। উভয় প্রশ্নেরই তারা অস্বীকার করলেও পরীক্ষক তাদের বক্তব্যকে অসত্য বলে মনে করেন।
যুদ্ধের একটি পদ্ধতি
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” এবং বিদ্যমান প্রমাণের জটিলতার বিষয় বিবেচনা করে অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার “ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি” ন্যায্য বিচারের মৌলিক অধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশটির সাবেক শীর্ষ সামরিক আইনজীবী ইফাত তোমের-ইয়েরুশালমি চ্যানেল ১২–এ নজরদারি ফুটেজ ফাঁস করার কথা স্বীকার করেন এবং পরে একটি ফৌজদারি তদন্তের পর পদত্যাগ করেন।
মিডল ইস্ট আই, সিএনএন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সদে তেইমান কারাগারে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্যাতনের ঘটনা শুধু সদে তেইমানেই সীমাবদ্ধ নয়; ইসরায়েলের বিভিন্ন কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার পদ্ধতিগত ব্যবহারও নথিভুক্ত হয়েছে।
একটি তদন্তে জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে, যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণকে “যুদ্ধের একটি পদ্ধতি” হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—যার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনি জনগণকে অস্থিতিশীল করা, দমন করা এবং ধ্বংস করা।
গত ডিসেম্বর পৃথক ইসরায়েলি কারাগারে আটক দুই ফিলিস্তিনি বন্দী মিডল ইস্ট আই–কে তাদের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
একজন জানান, তাকে লাথি মারা, পদদলিত করা, অপমান করা এবং চোখ বেঁধে কোনো বস্তু দিয়ে ধর্ষণ করা হয়, আর ইসরায়েলি প্রহরীরা তা দেখেও হাসাহাসি করছিল।
আরেকজন দাবি করেন, সৈন্যরা তাকে ধর্ষণ করার জন্য একটি কুকুর ব্যবহার করেছিল।

