ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া নতুন সংঘাত এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের দাম বাড়ার কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধকে সফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং বুধবার তিনি দাবি করেন, “আমরা জিতেছি—প্রথম ঘণ্টাতেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।” কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
কারণ এখনও পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ইরান সতর্ক করে দিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থনৈতিক চাপ কতটা তীব্র হবে তা মূলত নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর—যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে। সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির বিশ্লেষক র্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং একই মাত্রায় সংঘাত চলতে থাকে, তাহলে তেলের দাম আরও বাড়বে এবং ভোক্তাদের জন্য বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠবে। তবে সংঘাত দ্রুত শেষ হলে দামও দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে।
তবে যুদ্ধ যদি কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, তখন ১৯৭০-এর দশকের মতো ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। স্ট্যাগফ্লেশন এমন একটি অবস্থা যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়, বেকারত্ব বাড়ে এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বৃহস্পতিবার তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বিশ্ব তেলবাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্যাম অরি বলেন, অতীতে যখন তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে জিডিপির চার থেকে পাঁচ শতাংশের সমান হয়ে গেছে, তখন প্রায় সব সময়ই অর্থনীতি মন্দার দিকে গেছে। তিনি মনে করেন, যদি তেলের দাম বছরের বেশির ভাগ সময় ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। কারণ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি সরবরাহ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ছয় মাসের মতো সময় প্রণালিটি বন্ধ থাকবে—এমন পরিস্থিতি আগে কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই নিশ্চয়তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনেও দেখা যাচ্ছে। গ্যাসবাডি অ্যাপের পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডিহান জানিয়েছেন, বুধবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ৩.৫৯ ডলার, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৬৫ সেন্ট বেশি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ যত সপ্তাহ চলবে, তত সপ্তাহই পেট্রোলের দাম আরও ২৫ থেকে ৪০ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে বিভিন্ন পণ্যের দামও। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বের অনেক বন্দরে জট তৈরি হয়েছে। ফলে পণ্য পরিবহনে দেরি হচ্ছে এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে যে তেল ও তেলজাত পণ্য বিশ্ববাজারে সরবরাহ হয়, তা শুধু জ্বালানিই নয়—প্লাস্টিক, ওষুধ এবং সার তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ভবিষ্যতে এসব শিল্পেও প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনেও সমস্যা তৈরি হতে পারে, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হিলিয়াম সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে গাড়ি উৎপাদনসহ প্রযুক্তি শিল্পেও বিলম্ব দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে সুদের হার কমানো কঠিন হয়ে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহঋণের সুদের হার ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ৫.৯৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ মার্চ পর্যন্ত ৬.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে সরকারের বাজেটে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট’-এর গবেষক হেইডি পেল্টিয়ার বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সুদ পরিশোধেই যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। নতুন যুদ্ধ শুরু হলে সেই ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হবে তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে যুদ্ধ কত দ্রুত শেষ হয় এবং হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত আবার খুলে দেওয়া যায় তার ওপর।

