মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক এই হামলায় অন্তত ছয়টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে দুটি জাহাজে আগুন ধরে যায়। এসব ঘটনায় একজন ক্রু নিহত হয়েছেন এবং মোট আটজন নাবিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়া পারস্য উপসাগরে আরও চারটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। হামলা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে পুরো অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক বিভিন্ন জাহাজে আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে।
এই ঘটনার পর বিশ্ববাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। গত বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাবেই এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬টি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বুধবার গভীর রাতে হামলার শিকার হওয়া দুটি জাহাজ হলো মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী “সেফ সি বিষ্ণু” এবং মাল্টার পতাকাবাহী “জেফিরোস”। জাহাজ দুটি ইরাক থেকে জ্বালানি পণ্য নিয়ে যাত্রা করেছিল।
হামলার পর ইরাক তাদের বন্দরের তেল সরবরাহ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বাগদাদে ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, নিহত ক্রুদের একজন ভারতীয় নাগরিক।
ইরাকের জেনারেল কোম্পানি ফর পোর্টসের প্রধান ফারহান আল-ফারতুসি জানান, হামলার পর উদ্ধার অভিযানে ৩৮ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থলভাগেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের অভ্যন্তরে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
অন্যদিকে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরাকের কুর্দিস্তানে একটি ইতালীয় সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ইরান ইসরায়েল লক্ষ্য করে দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার পাশাপাশি লেবাননেও ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এতে বৃহস্পতিবার অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩৪ জনে, আহত হয়েছেন ১,৫৮৬ জন।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ লেবানন দখলের হুমকি দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
এই সংঘাত ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ডে থাকা যৌথ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জাতির উদ্দেশে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় তাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে ওই দেশগুলোর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
খামেনি হরমুজ প্রণালিকে ইরানের কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে প্রয়োজনে এই প্রণালি বন্ধ রাখা হবে।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ বন্ধের জন্য তিনটি শর্ত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরানের ন্যায্য অধিকার স্বীকৃতি দিতে হবে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর হামলা হবে না—এমন আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য নতুন হামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বি-১ বোমারু বিমানকে “বাংকার বাস্টার” বোমা দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনায় হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়।
এসব ঘটনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল।
মেরিল্যান্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “স্পষ্ট করে বললে, ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।”
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের আকাশসীমায় নির্বিঘ্নে অভিযান চালাতে পারছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

