গত মাসের শেষ দিনে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে তেহরানও দ্রুত পাল্টা আঘাত হানে। ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান, যা ধীরে ধীরে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে ইতোমধ্যে ইসরায়েলে আহত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার ৯৭৫ জন আহত হয়েছেন।
সংঘাতের এই সময়টাতে শুধু ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে অথবা যুক্তরাষ্ট্র সেনা মোতায়েন করেছে, সেসব স্থাপনাকেও লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান বা তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো।
ইসরায়েল যদিও এই অভিযানের অন্যতম নেতৃত্ব দিচ্ছে, তবু দেশটির ভেতরেও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়। রাজধানী তেল আবিব ও বন্দরনগরী হাইফাসহ বড় বড় শহরে প্রায় প্রতিদিনই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে উঠছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরুতে এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে।
সংঘাতের শুরুতেই ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং দেশটির আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা। এতে তেল আবিব ও ওয়াশিংটন প্রথমদিকে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এমনকি ট্রাম্প তখন মন্তব্য করেছিলেন, চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই তাদের সামরিক লক্ষ্য পূরণ হয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ালেও থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রত্যাশা অনুযায়ী ভেঙে পড়েনি।
খামেনির মৃত্যুর পর তার দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেওয়া প্রথম বক্তব্যেই তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের শহর জারজিরে একটি স্থাপনায় সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
এই হামলায় ৫৮ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া হামলার ভয়াবহতায় মানসিক চাপে ভেঙে পড়া আরও ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এই সংঘাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকতে পারেনি। বিভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে কমপক্ষে সাতজন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।
এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে একাধিক সামরিক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা সফল হবে না। তিনি লেখেন, “ইরানের রয়েছে ছয় হাজার বছরের পুরনো একটি সভ্যতার ইতিহাস। আজ পর্যন্ত কোনো বহিঃশত্রু ইরানের নাম মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। যারা মনে করছে ইরানকে ধ্বংস করা যাবে, তারা আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানে না।”
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে সামরিকভাবে দ্রুত দমন করা এত সহজ নয়—এটি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই সংঘাত শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক রাজনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

