আরটির বিশ্লেষণ—
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ কেবল আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামোকেও নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রুশ সাময়িকী রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান সম্পাদক ফিওদর লুকিয়ানভের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এমন এক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে পুরো বিশ্বব্যবস্থায় পড়তে পারে।
যুদ্ধের ঘোষিত কারণ ও বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযানকে ন্যায্যতা দিতে বলেছে যে, ইরান গোপনে অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম জমা করে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে এগোচ্ছিল। পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের দাবি ছিল, ইরান তাত্ত্বিকভাবে ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো উপাদান সংগ্রহ করেছে। তবে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহের বোমাবর্ষণের পর বিশ্লেষকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, পারমাণবিক আশঙ্কা এ সংঘাতের একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্ন।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের রূপান্তর
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতের শিকড় খুঁজতে হলে তিন দশক পেছনে যেতে হবে। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক কাঠামো মূলত ২০ শতকে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর পতনের সময় গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই কাঠামো ভাঙতে শুরু করে ১৯৯১ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট অপারেশন ডিজার্ট স্টর্ম পরিচালনা করে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে বিতাড়িত করে। এই যুদ্ধের সময়ই বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটে। একই সময়ে ভেঙে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং শেষ হয় শীতল যুদ্ধ। ফলে বিশ্বে একক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেড়ে যায়, যাকে অনেক বিশ্লেষক ‘একমুখী বিশ্বব্যবস্থার মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। এরপর একের পর এক সংকট মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দ্বন্দ্ব
মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য এক ধরনের কৌশলগত ফাঁদে পরিণত হয়েছে। একদিকে তারা সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমাতে চায়, অন্যদিকে অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। এই দুটি লক্ষ্য ক্রমেই পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে বহুবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে দূরবর্তী অঞ্চলের যুদ্ধে জড়ানো উচিত নয়। কিন্তু ইরান প্রসঙ্গে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইসরায়েলের ভূমিকা
বহু বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে গত বছর ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ইসরায়েলি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, তীব্র সামরিক আঘাত ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং হয়তো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে। তবে সেই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সংঘাত বাড়তে বাড়তে পুরো অঞ্চলেই অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

সম্ভাব্য নতুন আঞ্চলিক কাঠামো
বিশ্লেষকদের মতে, এ যুদ্ধের ফলে পশ্চিম এশিয়ায় একটি নতুন ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হতে পারে। সেখানে দুটি প্রধান ভিত্তি দেখা যেতে পারে।
প্রথমত, সামরিক শক্তির দিক থেকে অঞ্চলে ইসরায়েলের প্রাধান্য। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্কের আরও গভীরতা। এ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যটা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব একেবারে কমে যাবে। আর ইরান আরও শক্তিশালী হবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
তবে বড় প্রশ্ন হলো—যদি ইরান সামরিকভাবে পরাজিত হয়, এরপর কী হবে? বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দেন, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র বিজয় ঘোষণা করলেও পরে দীর্ঘ অস্থিরতা দেখা দেয়।
ইরান ইরাকের তুলনায় অনেক বড়, জটিল এবং জনসংখ্যায় সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। ফলে সেখানে ক্ষমতার পতনের পর কী ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হবে, তা অনুমান করা কঠিন।
বৈশ্বিক প্রভাব
এ যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক ব্যবস্থায়। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক দেশ মনে করছে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতা ও সম্ভব হলে পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি এমন একটি ঘটনা, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন
হামলা শুরু করে পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলার দাবি করলেও বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে
যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠতে পারে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক জোট আরও শক্তিশালী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাত আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে দেশগুলোকে আরও শক্তিশালী সামরিক ও পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারে।

