লেবাননে সীমান্তে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা উপত্যকায় যে ধরনের সামরিক কৌশল বা ‘ডকট্রিন’ প্রয়োগ করা হয়েছিল, এখন সেই একই কৌশল লেবাননেও অনুসরণ করা হচ্ছে।
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে—বেসামরিক জনগণকে ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ করা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোকে অকার্যকর করে দেওয়া।
সাম্প্রতিক সংঘাতে মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় ৬০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, যা দেশটির জন্য একটি বড় মানবিক সংকট তৈরি করেছে।
এই বাস্তুচ্যুত মানুষের অনেকেই এখন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল কিংবা তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক কৌশলের প্রথম ধাপ হলো নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া। কখনো সরাসরি নির্দেশ দিয়ে, আবার কখনো জীবনধারণের উপায় ধ্বংস করে মানুষকে বাধ্য করা হয় এলাকা ত্যাগ করতে।
এরপর সেই অঞ্চলগুলোতে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে একটি তথাকথিত ‘বাফার জোন’ বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ বা সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হতে পারে।
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিন ধরে এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গাজায় যেমন পুরো উত্তরাঞ্চল খালি করার নির্দেশ দিয়ে এলাকাটিকে জনশূন্য করার চেষ্টা হয়েছিল, তেমনি লেবাননের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ও মানচিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে বৈরুত এবং দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় এই ধরনের কৌশল কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে।
আশির দশকে লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি অনুগত সরকার গঠন করা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গাজার অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ইসরাইল এখন সরাসরি কোনো সরকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে বরং একটি অঞ্চলকে প্রশাসনিকভাবে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইসরাইল ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
স্কুলগুলো এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসাকর্মীরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। এমনকি সমুদ্রতীরবর্তী অস্থায়ী তাঁবুতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে দেশটির রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকিও দিয়েছে ইসরাইল।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতি এক নয়।
গাজায় হামাস একটি অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে সীমিত রসদ নিয়ে লড়াই করলেও হিজবুল্লাহর কাছে রয়েছে উন্নত অস্ত্রভাণ্ডার, সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধ প্রস্তুতি।
ফলে দক্ষিণ লেবানন এবং বেকা উপত্যকায় ইসরাইলি স্থল অভিযান ইতোমধ্যে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়েছে।
এদিকে ইরানও ঘোষণা করেছে যে, লেবাননের পরিস্থিতি যেকোনো যুদ্ধবিরতি আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতকে একত্রে যুক্ত করার একটি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই সমরকৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা থাকলেও কার্যকর কোনো জবাবদিহিতা এখনো দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আদালত কিংবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপের আলোচনা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন বারবার লঙ্ঘনের মাধ্যমে এই ধরনের পদক্ষেপকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তা না হলে এই সংঘাত শুধু লেবানন বা গাজাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠতে পারে

