ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হামলার পর তার দাবি, দ্বীপে থাকা সামরিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন এক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানও কঠোর ভাষায় পাল্টা হুমকি দিয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ইরানের সামরিক বাহিনীর আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ফলে সংঘাত কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে জ্বালানি অবকাঠামো কেন্দ্রিক একটি বৃহত্তর সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, আপাতত খারগ দ্বীপের তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে যদি কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত দ্রুত পরিবর্তন করা হতে পারে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, খারগ দ্বীপের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ভবিষ্যৎ সামরিক হিসাব-নিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদান হয়ে থাকতে পারে।
পারস্য উপসাগরে ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপ আয়তনে ছোট হলেও জ্বালানি কৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিশাল তেল সংরক্ষণ ট্যাংক, একাধিক লোডিং টার্মিনাল এবং বড় তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য বিশেষ জেটি রয়েছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল এনে এখানে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের টার্মিনাল ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।
এই কারণেই খারগ দ্বীপকে প্রায়ই ইরানের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। তেল রপ্তানি ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এই দ্বীপের অবকাঠামো ব্যবহার করে তেল রপ্তানি চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। ফলে খারগ দ্বীপের কার্যক্রম যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তাহলে তা সরাসরি ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

ইতিহাসও দেখায় যে সংঘাতের সময় খারগ দ্বীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি বাহিনী একাধিকবার এই দ্বীপের তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। তবুও ইরান দ্রুত অবকাঠামো পুনর্গঠন করে তেল রপ্তানি চালু রাখতে সক্ষম হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আজও দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে খারগ দ্বীপ আবারও সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কারণ এই দ্বীপের ওপর হামলা বা এর কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটলে শুধু ইরানের অর্থনীতিই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়, ফলে এখানকার যেকোনো অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে খারগ দ্বীপকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ গতিপথ শুধু সামরিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপরও অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

