মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে সেখানে আরও সেনা ও নতুন যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার ওই দুই কর্মকর্তার বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদমাধ্যম এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে পাঠানো বাহিনী সমুদ্র ও স্থল—দুই ক্ষেত্রেই সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা দ্রুত যেকোনো স্থানে অভিযান চালাতে পারবে।
একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন এই বাহিনীর নেতৃত্বে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি।
এই ধরনের যুদ্ধজাহাজকে বলা হয় এমন এক বিশেষ যুদ্ধজাহাজ, যার মাধ্যমে সমুদ্র থেকে সরাসরি স্থলভাগে সেনা, সামরিক যান এবং হেলিকপ্টার নামানো যায়। আধুনিক যুদ্ধে এই ধরনের জাহাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
খবরে বলা হয়েছে, ইউএসএস ত্রিপোলির নেতৃত্বে থাকা এই বাহিনীতে সাধারণত প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সেনা থাকে। তারা কয়েকটি যুদ্ধজাহাজে ভাগ হয়ে সমুদ্রে অবস্থান করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত অভিযান চালাতে পারে।
মার্কিন বাহিনীর নতুন মোতায়েনের খবর এমন সময় সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে হরমুজ প্রণালির খারগ দ্বীপে ইরানের সামরিক অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের বড় একটি অংশের তেল এই পথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে যায়। ফলে এই এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুব শিগগিরই মার্কিন নৌবাহিনী অভিযান শুরু করতে পারে।
এই বিষয়ে শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজ “খুব শিগগিরই” শুরু হতে পারে।
আরেকটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানোর অনুরোধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই প্রস্তাবে অনুমোদন দেন।
তবে ভবিষ্যতে কোথায় কত সেনা মোতায়েন করা হবে—এই ধরনের বিষয় সাধারণত প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে জানায় না মার্কিন সামরিক বাহিনী।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থাপিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশও মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি বিবেচনা করেই যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
বর্তমান উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এরপর থেকেই অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহেই ইরানের প্রায় ৬ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ইরানের ওপর আরও “কঠোর” আঘাত হানা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ হবে তখনই, যখন তিনি নিজের ভেতর থেকে অনুভব করবেন যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে তেল পরিবহন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

