দ্য ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণ—
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কি মারা গেছেন, নাকি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ছয়টি আঙুল আছে—এমন প্রশ্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি ভাষণের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে নানা দাবি সামনে আসে।
ভিডিওটি ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের সময় প্রকাশিত হয়েছিল। কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী দাবি করেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এবং সেখানে নেতানিয়াহুর হাতে ছয়টি আঙুল দেখা গেছে। অন্যদিকে কেউ কেউ দাবি করেন, ইসরায়েলি নেতা মারা গেছেন।
তবে তথ্য যাচাই এবং সরকারি বিবৃতিতে এসব দাবিকে ভিত্তিহীন বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জীবিত এবং সক্রিয় রয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তার নিরাপত্তা ও অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেন, ভিডিওর একটি ফ্রেমে নেতানিয়াহুর হাতে ছয়টি আঙুল দেখা যাচ্ছে এবং সেটি এআই দিয়ে তৈরি বলে তারা ধারণা দেন।
একই সময়ে এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের সময় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মারা গেছেন। তবে ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে এসব দাবি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্লেষক ও অনলাইন যাচাইকরণ সরঞ্জাম জানিয়েছে, ছয়টি আঙুল দেখানোর স্ক্রিনশটটি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও থেকে নেওয়া একটি একক ফ্রেম। ক্যামেরার কোণ ও দৃশ্য বিকৃতির কারণে এমন বিভ্রম তৈরি হয়েছে।
এক্সে পোস্ট আসার পর “ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কি মারা গেছেন” এই প্রশ্নটি ট্রেন্ডিং হয়ে ওঠে। একটি ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়, নেতানিয়াহু মারা গেছেন এবং তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বার্তা পরে মুছে ফেলা হয়েছে।
পোস্টটিতে লেখা ছিল, “সকলের সাবধান। নেতানিয়াহু মারা গেছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল হ্যান্ডেল এই টুইটটি মুছে দিয়েছে।”
তবে যাচাই করে দেখা যায়, দাবিটি মিথ্যা। ভাইরাল পোস্টে ব্যবহৃত স্ক্রিনশটটি ভুয়া। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে এমন কোনো বার্তা মুছে ফেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এআই চ্যাটবট গ্রোকও এই দাবির জবাবে জানায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কোনো টুইট মুছে ফেলেননি এবং অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটটি অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে ছিল না। ফ্যাক্ট-চেক গ্রুপ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর মৃত্যুর গুজব অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অযাচাইকৃত ভুল তথ্য।
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর মৃত্যুর গুজব আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ইরানি হামলা নেতানিয়াহুকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। পরে এসব দাবিও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।
কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের আচরণের সঙ্গেও এই গুজব যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। একটি ভিডিওতে তাকে সংবাদ সম্মেলন থেকে ফোন কল গ্রহণ করতে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে ফিরে আসার সময় তার অভিব্যক্তি দেখে কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি হতবাক ছিলেন এবং এর সঙ্গে নেতানিয়াহুর মৃত্যুর গুজবের সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে এই দাবি কেবল অনুমানভিত্তিক ছিল এবং স্কট বেসেন্ট এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
নেতানিয়াহুর ছয়টি আঙুল থাকার দাবি মূলত ভিডিও ভাষণের একটি ফ্রেম থেকে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি মঞ্চে বসে বক্তব্য রাখছেন এবং হাত দিয়ে ইশারা করছেন। সেই ভিডিওর একটি স্থির ছবিতে ছয়টি আঙুল দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
এর পর অনেক ব্যবহারকারী হাতের জুম করা ছবি শেয়ার করেন। পোস্টগুলোতে আঙুলের দিকে তীর চিহ্ন দিয়ে বলা হয়, এটি একটি এআই ত্রুটি।
জেনারেটিভ এআই ব্যবহারে তৈরি কিছু ছবিতে কখনও অতিরিক্ত আঙুল দেখা যায়—এই যুক্তি দেখিয়ে অনেকেই ভিডিওটিকে কৃত্রিম বলে দাবি করেন।
তবে গ্রোকের যাচাইয়ে বলা হয়েছে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হাতে অন্য সবার মতোই পাঁচটি আঙুল রয়েছে। হাতের কোণ, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল এবং স্ক্রিনশটে চিহ্নিত লাল বৃত্তের কারণে একটি দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়েছে।
ছবিটি একটি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে ছয়টি আঙুল নেই।
ভিডিওটি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ জানতে চান, নেতানিয়াহু নিরাপদে আছেন কি না।
এ বিষয়ে গ্রোক জানায়, নেতানিয়াহু তার অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও প্রকাশ করেছেন এবং ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তার কার্যালয় থেকেও বলা হয়েছে, তাকে বা তার পরিবারের ওপর হামলার বিষয়ে ইরানের কিছু দাবিও ভিত্তিহীন। এ ধরনের কোনো ঘটনার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নেতানিয়াহু সংঘাতের সময় জনসম্মুখে উপস্থিতি ও সরকারি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে—জায়োনিস্ট নেতা এখন কোথায়?
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ইসরায়েলেই রয়েছেন এবং চলমান সংঘাতের সময় ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, ভিডিও বার্তা ও সরকারি কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
নেতানিয়াহু বা তার পরিবারের ওপর হামলার দাবি ইরানের কিছু সূত্র থেকে এলেও তার কার্যালয় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তার ক্ষতির কোনো নিশ্চিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি এবং তিনি এখনও সরকারি কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন।




