মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখানে জাহাজ চলাচল এখন প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে গেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ফলে এই পথ অচল হয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব শিপিং কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী জো ক্রামেক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই সংঘাতের সঙ্গে নাবিকদের কোনো সম্পর্ক নেই, তবু তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন।
তিনি বলেন, “নাবিকরা এই সংঘাতের অংশ নয়, কিন্তু তারা এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে।”
তার মতে, সমুদ্রপথে কাজ করা হাজারো নাবিক এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে যেকোনো মুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ রাইট বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন।
তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি পার হওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি উপসাগরের ভেতরে অবস্থান করাও নিরাপদ নয়। অর্থাৎ জাহাজ মালিকদের সামনে এখন এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে যেদিকেই যাওয়া হোক না কেন ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, তবুও কিছু জাহাজ কোম্পানি ঝুঁকি নিয়েই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
গ্রিসের ধনকুবের জর্জ প্রকোপিউর মালিকানাধীন জাহাজ কোম্পানি ডায়না কম চলতি মাসের শুরুতে তাদের অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ এই প্রণালি পার করিয়েছে।
এতে বোঝা যায়, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক প্রয়োজনের কারণে সমুদ্রপথ ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে।
ঝুঁকি নিয়ে উপসাগর ছাড়ার আহ্বান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলবাহী জাহাজের মালিকদের ঝুঁকি নিয়ে উপসাগর এলাকা ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে জাহাজ পরিচালনাকারী অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, নৌবাহিনীর সরাসরি নিরাপত্তা ছাড়া এই পথ দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, এই মাসের শেষ দিকে নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় জাহাজ চলাচল শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে জাহাজ পরিচালনাকারীদের অনেকেই এ বিষয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি ছাড়াও ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগর—এই দুই এলাকাতেও বিভিন্ন স্থানে জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে ইরানের।
জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান স্টেনা বাল্ক-এর প্রধান নির্বাহী এরিক হোনেল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত পুরো এলাকা নিরাপদ করে তুলতে পারবে—এমনটা তিনি মনে করেন না।
তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের একটি মার্কিন পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ১ মার্চ বাহরাইনের একটি বন্দরে হামলার শিকার হয়েছিল। এই ঘটনার পর অনেক প্রতিষ্ঠান আরও সতর্ক হয়ে গেছে।
মাইন বসানো হলে পুরো পথ বন্ধ হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরক মাইন বসানো হয়, তাহলে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমনকি মাইন থাকার গুজব ছড়িয়ে পড়লেও অনেক জাহাজ কোম্পানি এই পথে চলাচল করতে ভয় পাবে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। তাই এখানে জাহাজ চলাচল কমে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

