সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এমন অনেক ছবি দেখা যাচ্ছে, যা দেখে মনে হতে পারে এগুলো চার দশক আগের কোনো পারিবারিক অ্যালবামের পাতা থেকে উঠে এসেছে। কারও গায়ে আশির দশকের পোশাক, কারও মাথায় সেই সময়ের জনপ্রিয় চুলের স্টাইল, পেছনে পুরোনো শহরের রাস্তা, স্টুডিও লাইটিং কিংবা ফিল্ম ক্যামেরার দানাদার আবহ। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই ছবিটি সত্যিই পুরোনো, নাকি নতুন কোনো ছবিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে অতীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ছবির বড় অংশই বর্তমান সময়ের মানুষের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সাহায্যে নিজের বর্তমান ছবিকে আশির দশকের কল্পিত রূপে সাজিয়ে নিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা এখন শুধু একটি ছবি তৈরির বিষয় নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে এক ধরনের বৈশ্বিক নস্টালজিয়া-ভিত্তিক সামাজিক ট্রেন্ডে।
চার দশক আগের ছবি আসলে কোথা থেকে এলো?
বর্তমানের এই রেট্রো ট্রেন্ডে মানুষ নিজের ছবি ব্যবহার করে সেটিকে আশির দশকের আবহে পুনর্নির্মাণ করছেন। এআই প্রযুক্তি ছবির মূল ব্যক্তির মুখের বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে পোশাক, চুলের ধরন, আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড, ক্যামেরার টেক্সচার এমনকি পুরোনো ফিল্মের মতো দানাদার ভাবও যুক্ত করছে।
ফলে একটি আধুনিক ছবি দেখতে এমন মনে হচ্ছে, যেন সেটি কোনো পুরোনো পারিবারিক অ্যালবাম, সিনেমার পোস্টার কিংবা আশির দশকের স্টুডিও ফটোশুট থেকে পাওয়া।
এই প্রবণতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে শুধু পুরোনো ছবি পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে না। বরং এমন একটি অতীত তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে একজন মানুষকে এমন এক সময়ে দেখানো হচ্ছে, যে সময় হয়তো সে নিজে দেখেনি। কেউ হয়তো তখন শিশু ছিল, আবার কারও জন্মই হয়নি। অর্থাৎ এআই এখন শুধু স্মৃতি সংরক্ষণ করছে না, মানুষের কল্পিত স্মৃতিকেও দৃশ্যমান করে তুলছে।
কেন আশির দশকের প্রতি এত আকর্ষণ?
এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে নস্টালজিয়া। আশির দশককে অনেকেই দেখেন অ্যানালগ জীবনের প্রতীক হিসেবে। ক্যাসেট, ভিসিআর, ফিল্ম ক্যামেরা, পুরোনো সিনেমার পোস্টার, রঙিন পোশাক, বড় চুলের স্টাইল কিংবা পাড়ার পরিচিত রাস্তা- এসব উপাদান বর্তমানের অতিমাত্রায় পরিষ্কার ডিজিটাল জীবনের বিপরীতে এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে।
আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই সেই সময়টি সরাসরি অভিজ্ঞতার নয়, বরং সিনেমা, পুরোনো ছবি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিচিত একটি কল্পিত অতীত। তাই আশির দশকের এই আকর্ষণ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব স্মৃতি নয়, বরং একটি নান্দনিক কল্পনা।
পুরোনো ছবির সামান্য ঝাপসা ভাব, ফিল্ম গ্রেইন, বিবর্ণ রং কিংবা ক্যামেরার সীমাবদ্ধতা এখন আর ত্রুটি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এগুলোই হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের অংশ।
কয়েকটি নির্দেশনাতেই বদলে যাচ্ছে পুরো সময়কাল
এই ধরনের ছবি তৈরির জন্য এখন আর জটিল ফটো এডিটিং সফটওয়্যারের প্রয়োজন হচ্ছে না। ব্যবহারকারী নিজের ছবি এআই প্ল্যাটফর্মে দিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা বা (prompt) দিলেই ছবিকে আশির দশকের স্টাইলে রূপান্তর করা যাচ্ছে।
সাধারণত ব্যবহারকারীরা নির্দেশ দেন- মুখের বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রেখে আশির দশকের পোশাক, চুলের ধরন, পুরোনো রাস্তার দৃশ্য, ফিল্ম ক্যামেরার আলো এবং সেই সময়ের রঙের আবহ যোগ করতে।
আধুনিক জেনারেটিভ এআই-এর উন্নতির কারণে এসব পরিবর্তন এখন সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্যও সহজলভ্য হয়েছে। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ নিজের ছবিকে আশির, নব্বই কিংবা আরও পুরোনো দশকের মানুষের মতো করে তুলছেন।
তবে প্রযুক্তির সাফল্য শুধু পোশাক বা রঙ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এআই একটি ছবির পুরো পরিবেশকে একই সময়ের বলে মনে করানোর চেষ্টা করছে। ফলে পোশাক, চুল, আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ছবির টেক্সচার একসঙ্গে বদলে গিয়ে তৈরি করছে একটি বিশ্বাসযোগ্য পুরোনো আবহ।
Instagram-এর ‘Add Yours’ ফিচারে বাড়ছে জনপ্রিয়তা
এই প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ইনস্টাগ্রাম-এর ‘Add Yours’ ফিচারও ভূমিকা রাখছে। একজন ব্যবহারকারী নিজের তৈরি ছবি শেয়ার করার পর অন্যরাও একই ধরনের ছবি তৈরি করে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
ফলে একটি ছবি বা একটি এআই প্রম্পট থেকেই তৈরি হচ্ছে অসংখ্য নতুন সংস্করণ। এ কারণে এটি শুধু এআই ছবি তৈরির প্রযুক্তিগত বিষয় হয়ে থাকছে না; বরং একটি অংশগ্রহণমূলক সামাজিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, তারকারাও যুক্ত হচ্ছেন
আশির দশকের এআই লুক এখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের তারকা ও পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভারতের অভিনেতা-অভিনেত্রী ও টেলিভিশন তারকারাও এআই ব্যবহার করে আশির দশকের স্টাইল তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালও এমন একটি এআই-নির্মিত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন, যেখানে তাকে পুরোনো হিন্দি সিনেমার নায়কের আদলে দেখা যায়।
অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ান টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব Xuxa (শুশা) নিজের আশির দশকের আসল ছবিও প্রকাশ করেছেন। মজার ছলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, আশির দশকের লুক তৈরির জন্য তার এআই-এর প্রয়োজন নেই।
এই ট্রেন্ডের শুরু কোথায়?
আশির দশকের এআই ছবি তৈরির এই প্রবণতার নির্দিষ্ট সূচনাকারী বা প্রথম পোস্ট এখনো নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগস্টের শেষ দিক থেকেই এ ধরনের ছবি ও প্রম্পট দেখা যেতে শুরু করে। এরপর সেপ্টেম্বরের শুরুতে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একটি মাত্র ইনস্টাগ্রাম রিলকে এই ট্রেন্ডের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা এখনো সম্ভব নয়।
পুরোনো এআই ট্রেন্ডের নতুন সংস্করণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-ভিত্তিক ছবি তৈরির প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ব্যবহারকারীরা নিজেদের স্টুডিও জিবলি-ধাঁচের চরিত্রে রূপ দিয়েছেন, আবার কখনো খেলনার প্যাকেজে থাকা অ্যাকশন ফিগারের মতো ছবি তৈরি করেছেন।
আশির দশকের এই প্রবণতাও সেই ধারারই নতুন রূপ। তবে এবার পার্থক্য হলো, মানুষ শুধু একটি কল্পিত চরিত্র তৈরি করছে না; বরং নিজেকেই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষ হিসেবে কল্পনা করছে।
এই সময়টি হয়তো তার নিজের জীবনের অংশ ছিল না, কিন্তু সিনেমা, সংস্কৃতি ও পুরোনো ছবির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে তার একটি ধারণা।
ছবি যখন শুধু ছবি নয়
এই রেট্রো ট্রেন্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ছবি ও বাস্তবতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। একসময় একটি ছবি কোনো ঘটনা বা মুহূর্তের দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে মানুষের কাছে বিশেষ বিশ্বাসযোগ্যতা বহন করত। কিন্তু জেনারেটিভ এআই এখন এমন দৃশ্য তৈরি করতে পারছে, যা দেখতে বাস্তব হলেও কখনো ঘটেনি।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো এআই-তৈরি কনটেন্ট শনাক্ত ও লেবেল করার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মেটা জানিয়েছে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে এআই-তৈরি ছবি শনাক্ত করতে তারা প্রযুক্তিগত সংকেত ও ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে এআই সংক্রান্ত তথ্য বা ‘AI info’ লেবেল দিতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, সব এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত করা এখনো সম্ভব নয় এবং এই প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চলছে।
শেষ পর্যন্ত আশির দশকের এই এআই ট্রেন্ড শুধু পুরোনো ফ্যাশনে ফিরে যাওয়ার গল্প নয়। এটি দেখাচ্ছে, মানুষ অতীতকে শুধু মনে রাখতেই চায় না, বরং নিজের মতো করে নতুনভাবে কল্পনাও করতে চায়।
এআই এখন সেই কল্পনাকে ছবিতে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। ফলে স্মৃতি, কল্পনা এবং বাস্তবতার সীমারেখা ধীরে ধীরে আরও অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

