যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিকে স্মরণ
বাংলা কবিতায় প্রেম ও দ্রোহকে পাশাপাশি হাঁটিয়েছেন কবি হেলাল হাফিজ। আজ ৭ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন। ব্যক্তিগত অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা, অভিমান ও ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও তারুণ্যের বিদ্রোহ। এ কারণেই পাঠকের কাছে তিনি ‘প্রেম ও দ্রোহের কবি’ হিসেবে পরিচিত।
জন্ম ও শৈশব
১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে জন্ম হেলাল হাফিজের। বাবা খোরশেদ আলী তালুকদার, মা কোকিলা বেগম। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে নেত্রকোণায়।
শিক্ষাজীবন ও কবিতার শুরু
ছাত্রজীবনেই কবিতার প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায় তাঁর। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিদ্যালয়ের দেয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা। নেত্রকোণা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।
ষাটের উত্তাল সময় ও ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’
ষাটের দশকের শেষভাগের আন্দোলন-সংগ্রাম তাঁর কবিসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আবহে লেখা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা তাঁকে তরুণদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। যৌবনকে মিছিলে ও যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বান জানানো এই কবিতার পঙ্ক্তি শুধু কবিতার অংশ হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল তারুণ্যের প্রতিবাদী উচ্চারণ।
একাত্তরের অভিজ্ঞতা
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে অবস্থান করায় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যান। পরদিন নিজের আবাসিক হল ইকবাল হলে গিয়ে দেখেন ধ্বংসস্তূপ ও হত্যাযজ্ঞের চিহ্ন। সেখানেই কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরে দুজন আশ্রয়ের সন্ধানে বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে কেরানীগঞ্জের দিকে যান। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতার চেতনায় গভীর ছাপ ফেলে।
সাংবাদিকতা
১৯৭২ সালে দৈনিক পূর্বদেশে সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন হেলাল হাফিজ এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। পরে দৈনিক দেশ এবং দীর্ঘ সময় দৈনিক যুগান্তরে সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেয়।
কাব্যগ্রন্থ
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়; পরবর্তী সময়ে এর ৩৩টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রেম, বিরহ, দ্রোহ ও মানুষের অন্তর্গত অনুভূতির সহজ অথচ তীব্র প্রকাশ বইটিকে পাঠকের কাছে বিশেষ করে তোলে। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’, আর ২০১৯ সালে তৃতীয় ও শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’।
কবিতার বৈশিষ্ট্য
হেলাল হাফিজের কবিতার শক্তি ছিল সরল উচ্চারণ। জটিল শব্দের ভারে কবিতাকে আচ্ছন্ন না করে তিনি মানুষের পরিচিত অনুভূতি ও সময়ের বাস্তবতাকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রেমের কবিতায় আছে ব্যক্তিগত আবেগ ও নিঃসঙ্গতা, আর দ্রোহের কবিতায় অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান। ফলে তাঁর কবিতা একই সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের হৃদয় ও বৃহত্তর সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করেছে।
স্বীকৃতি ও প্রয়াণ
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন এই জনপ্রিয় কবি। ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
কবির জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা।

