‘কাশবনের কন্য’ এটি ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত শামসুদ্দীন আবুল কালাম রচিত একটি উপন্যাস।
পটভূমি-
কাশবনের কন্যা। নিঃসন্দেহে বাংলা কথা সাহিত্যের অমর গ্রন্থ। জীবনের প্রথম উপন্যাস লিখেই সবার দৃষ্টিকে তার নিজের দিকে নিয়ে গিয়েছিল শামসুদ্দীন আবুল কালাম। ঊপন্যাসটি হোসেনকে নিয়ে শুরু হলেও এ উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতেছিল হোসেনের কবিয়াল বন্ধু শিকদার। শিকদার কবিয়াল মানুষ। ঘরসংসার ত্যাগী পুরুষ।
মূলত উপন্যাসিক শিকদারকে জীবন সংগ্রামে পরাজীত, ভীরু এবং বাস্তবকে ভুলে থেকে গীত গান রচনা ও তা গাইতে থাকা এক যুবকে তুলে ধরেছেন। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন শিকদার যে গীত রচনা করে এবং তা গায় তা মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে না। বরং তার গানে শুধু বিষাদ রয়েছে কিন্তু মানুষের জীবন শুধু বিষাদে পরিপূর্ণ নয় এখানে রয়েছে হাসি, আনন্দ। রয়েছে সমাজের নানা কদাচার। আর এসব বিষয়ই আসতে হবে শিকদারের গীতে।
উপন্যাসের মূল উপজীব্যই হলো শিকদারের নতুন জীবনের সূচনা। জীবন সংগ্রামে নিজেকে সপে দেওয়ার মাধ্যমেই তাঁর নতুন জীবন শুরু হয়ে। সে জীবনকে দেখ নিতে চায়, সেখান থেকে অভিজ্ঞা অর্জন করে রচনা করতে চায় নতুন ধরনের গীত। যে গীতে থাকবে না শুধু একজন রমণীর জন্য আকুলতা। তাঁর গীতে শুনে মানুষ জীবন সংগ্রাম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে না বরং তার গীত শুনে মানুষ আরো উদ্দীপ্ত হবে। হতাশা নয় ঠিকে থাকার জন্য লড়াই করবে। সে প্রকৃত অর্থে একজন কবি হয়ে উঠতে চায়।
হোসেনকে দিয়ে উপন্যাস শুরু হলেও উপন্যাসিক যেনো হোসেনের প্রতি প্রচন্ড উদাসীনতা দেখিয়েছেন। সকিনা- হোসেনের প্রেম কিংবা মেহেরজান- হোসেনের প্রেম কোনটা বিয়ে নামক সম্পর্কে গিয়ে পৌছে সেটা আমরা শেষ পর্ষন্ত জানতে পারি নি। লেখক হোসেনকে নিয়ে আর লেখা এগুন নি।
উপন্যাসটি পড়ে আমরা পরিচিত হতে পারবো গ্রামীণ বিভিন্ন লোকাচারের সাথে। গ্রামীণ প্রেমের রূপও আমরা প্রত্যক্ষ করবো। এছাড়াও আমরা এ উপন্যাসে দেখবো পুরুষ শাসিত সমাজে মহিলাদের নানাভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে। শুধুই ভোগবিলাসের সামগ্রী হিসেবে তাঁদের বিবেচনা করা হচ্ছে। আবার আমরা এ উপন্যাসে দেখবো এক বিদ্রোহী নারী স্বত্বা জোবেদাকে। যার জন্যই শিকদার বেচে নিয়েছিল তার বৈরাগ্য জীবন।… স্বামী শাশুড়ির নানা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জোবেদা স্বামী গৃহ থেকে চলে আসে শিকদারের কাছে। তবে জোবেদা বিদ্রোহ করলেও তাকে পরাজীত হতে হয় সমাজের রীতিনীতির কাছে।
উপন্যাস সম্পর্কে বেশি কিছু বলব না। এই উপন্যাস লিখেই বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করেছিলে শামসুদ্দীন আবুল কালাম। এক কথায় অসাধারণ তার এ সৃষ্টি। পড়ে দেখতে পারেন। আশাকরি প্রচন্ড ভালো লাগবে।
গল্প সংক্ষেপে উপস্থাপন-
গ্রামীণ বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, হাসিকান্না, স্বপ্নকে উপজীব্য করে উপন্যাস। উপন্যাসের আখ্যান খুব জটিল নয়। মূলত দুই জোড়া নায়ক নায়িকার দুটি প্রায় সমান্তরাল কাহিনী এ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। ‘কাশবনের কন্য’ শামসুদ্দিন আবুল কালামের সবচেয়ে বিখ্যাত ও মিথিক্যাল উপন্যাস। উপন্যাসের প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। কানু শিকদার ও হোসেন পরস্পর বন্ধু। নদীর ধারে তাদের বাড়ি। নদী থেকে থেকে তারা বিশেষত ইলিশ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। কানু শিকদার আর হোসেনের জীবনে রয়েছে প্রকৃতি নির্ভরতা। রয়েছে প্রবল অনুভূতি- যার নাম প্রেম।
হোসেন সখিনাকে ভালোবাসে কিন্তু সখিনার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। অন্যদিকে শিকদারের ভালোবাসার পাত্রীর নাম জোবেদা। জোবেদারও বিয়ে হয়ে যায় সম্পদশালী গম্ভীর পুরুষ আসগারুল্লার সাথে। কানু শিকদার জোদেদাকে পেয়ে কবিয়াল জীবনেই মুক্তি পথ খুঁজে। অন্যদিকে হোসেন ভূমিহীন ছবদারের অসহায়ত্ব দেখে ছবদারের মেয়ে মেহেরজানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। কানু শিকদার ও হোসেনের জীবনকে অবলম্বন করে এ উপন্যাসের গতি পেয়েছে।
উপন্যাসে বরিশাল অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, লোকজীবন ও গ্রামীণ দিগন্ত ফটোগ্রাফিকভাবে চিত্রায়িত। কানু শিকদার, হোসেন, জোবেদা, মেহেরজান ও সখিনা প্রভৃতির মুখের আঞ্চলিক কথা, লোকসংগীত এবং প্রচলিত লোক প্রবচন ইত্যাদির ব্যবহার উপন্যাসকে করে তুলেছে সুপাঠ্য ও বিশ্বস্ত। রোমান্টিক মনসংগীতে এমন এক গ্রাম- গ্রামের আশা সঞ্চারী ও নিম্ন বর্ণের মানুষদের নিয়েই এর কাহিনী।
সখের গায়ক কানু শিকদারের রক্তে গানের সুর। তার বাবা জয়জামালী ও দাদা করম আলী গায়েন ছিলেন। করম আলীর স্মৃতিকে ভুলতে পারে না গৃহে থেকেও সন্ন্যাসী কানু শিকদার।
কানু শিকদারের পরমজন হোসেন। তার চলনে, অন্নসংস্থান জোটাতেও প্রাণান্ত। হোসেন স্বভাবে কানু শিকদারের ঠিক উল্টো। সে গৃহ কাতর। সংসারধর্মে সদা মনযোগী পুরুষ। তার মন টানে গঞ্জে আলীর ষোড়শী কন্য সখিনার প্রতি। সখিনাকে নিয়ে সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু স্বপ্নালু হোসেনকে ফাঁকি দিয়ে সখিনার বিয়ে হয়ে যায়। হতাশ হোসেনের ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় কি? এই সময় তার জীবনে আসে ঘাটের বৃদ্ধ সবদারের মেয়ে মেহেরজান। সে কি পাবে বিবাহিত মেহেরজানকে?
‘কানু বিনে গীত নাই’। কানু শিকদারের গীতের সুরের প্রেরণা জোবেদা। এই জোবেদার জন্য কানু শিকদার সংসারী হতে পারল না। এদিকে আসগারুল্লার ঘরেও শান্তিতে নেই জোবেদা। শাশুড়ী আর স্বামীর যন্ত্রণায় তার জীবন দুর্বিষহ। সে এই জীবন থেকে ফিরতে চায়। ফিরে পেতে চায় কানু শিকদারকে। লেখকের ভাষায়- “কথা শেষ হইল না। আসগর আগাইয়া আসিয়া ধাঁ করিয়া তাকে এক চরে মাটিতে ফেলিয়া দিল: চোপা বড় বেশি অইছে, না? আদব- লেহাজ হারামজাদী!- জোবেদা যেন আঘাত খাওয়া সাপের মতই ফণা তুমিয়া ফিরিয়া চাহিল: পশু, চামার…। আসগরের লাথি আসিয়া পড়াতে বাক্য শেষ হইল না: কাঁধের উপর সেই লাথি আসিয়া লাগিতেই মনে হইল তাহার শরীরের আধখানা বুঝি ভাঙ্গি গেল- দম বন্ধ হইয়া গেল।”
এরপর-
লেখক একদিকে হোসেন-সখিনা বা হোসেন-মেহেরজানের উপাখ্যান, অন্যদিকে কানু শিকদার-জুবেদার উপাখ্যান কোনো একটা সুখকর বা আকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। বরং মনে হয়, তিনি যেন ইচ্ছা করে ওই পাঠক-মনোরঞ্জক ও তৃপ্তিবিধায়ক পরিসমাপ্তি থেকে পলায়ন করেছেন, বা সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকেছেন। তাঁর লক্ষ্যই তা ছিল না।
আখ্যানভাগ খুব জটিল প্রকৃতির নয়। দুই নায়ক পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও নায়িকাদের পরস্পরের সঙ্গে কোনো যোগ নেই। হোসেনের ক্ষেত্রে দুটি নায়িকা, সময়ক্রমে একে অন্যের অনুবর্তী-সখিনা আর মেহেরজান।শিকদারের ক্ষেত্রে একটি, জুবেদা।
হোসেনের উপাখ্যানে হোসেন-সখিনার সম্পর্কের মধ্যে গ্রাম্য প্রেমের চেহারাটাও ততো স্পষ্ট হয়নি। সখিনাকে বিয়ে করার কথা হোসেন ভেবেছে অনেকটা হঠাৎ কিশোরী সখিনাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে, নিজের সাংসারিক প্রয়োজনের কথা হিসেব করে। সখিনার বাবা গঞ্জে আলীর প্রতি তার নিজের বাবার অত্যাচারের স্মৃতিতে তার অনুতাপও হয়তো সখিনার প্রতি হোসেনের মনকে আর একটু নিবিষ্ট করে। কিন্তু তা ঠিক প্রেমের, এমনকি পূর্বরাগের পুরো বিস্তার পায় না। হয়তো ওই সমাজের বাস্তব তার অনুকূল ছিল না।
সখিনার বিয়ে হয়ে যায়, অত্যাচারিত হয়ে স্বামীর ঘর থেকে সে ফিরে আসে, তার পরে সখিনার মা হোসেনের প্রতি মেয়ের অনুরাগের কথা জানতে পারে। কিন্তু ততোদিনে হোসেন-সখিনার আখ্যান থেকে ছবদার মাঝির ইতিবৃত্তে ঢুকে পড়েছে। সে আর এ খবর পায় না। যে এ খবর জানল, সেই বন্ধু কানু শিকদার তাকে এ খবর দেবারও সুযোগ পায় না। হোসেনের জীবনের এই দ্বিতীয় পর্বে তার সমানে আসে মেহেরজান, এবং মেহেরজানও স্বামী-পরিত্যক্তা এবং গ্রামের পুরুষপ্রজাতির লোভে তার নিরাপত্তা যথেষ্ট অনিশ্চিত।
‘গ্রামে দুষ্ট কোলের অভান নেই- কাহারো বাড়িতে গিয়া কাজ করিয়া খাইবে সে উপায়ও নাই’ মুমূর্ষ ছবদার মাঝিকে পৌঁছে দিতে আসা সহানুভূতিশীল শক্তসমর্থ যুবক হোসেনের মধ্যে সে যে একটা মুক্তির সম্ভাবনা দেখবে তাতে কোনো বিস্ময় নেই। এখানে মেহেরজানের দিক থেকেই আকর্ষণের সূত্রগুলি প্রথমে তৈরি হয়। কিন্তু এখানেও সম্পর্ককে কোনো পরিণতিতে পৌঁছে দিতে ঔপন্যাসিকের অনীহা আমাদের বিস্মিত করে। হোসেন মেহেরজানকে এবং ছবদার মাঝির আখ্যান ছেড়ে চলে যায়, হয়তো নিজের এবং সখিনার প্রাক্তন জগতে ফেরার লক্ষ্যে। কিন্তু আমরা আর তার খবর পাই না।
উপন্যাসের শুরুতে মনে হয় এটা সম্ভবত হোসেনের গল্প, কানু শিকদার বুঝি এক গৌণ চরিত্র হয়ে থাকবে। কিন্তু আখ্যান একটু এগোলে দেখা যায়, কানু শিকদার-জোবেদার আখ্যান অনেক প্রাধান্য পেয়েছে। উপন্যাসের পঁচিশটি পরিচ্ছেদ। শুরুর দিকে তিনটি পরিচ্ছেদে হোসেন-সখিনার সূত্র আসে, কানু শিকদার গৌণভাবে উপস্থিত থাকে।
এছাড়াও-
দ্বিতীয়ত দুটি বা আড়াইখানা প্রেম-সম্পর্কের কোনোটিতেই লেখক পাঠকের প্রত্যাশাপূরণ করেন না। কেন? লেখক কি এর মধ্য দিয়ে কোনো একটা প্রতিবাদ জানাতে চান পাঠক-প্রত্যাশার ছকবাঁধা সূত্রের বিরুদ্ধে?
তাঁর চরিত্রগুলির মধ্যে জোবেদা ছাড়া আর কেউ তেমন প্রতিবাদী নয়। জোবেদা, সখিনা ও মেহেরজানের তুলনায় অনেক বেশি জটিল, নিজের ইচ্ছা ও শক্তিতে বিশ্বাসী। কারও প্রত্যাশা না করে নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তা যদি তার ধ্বংস ডেকে আনে তা হলেও। কানু শিকদারের প্রতি তার ‘হা রে পুরুষ!’ উক্তিটি কবি-দার্শনিক-গায়ক, অর্থাৎ বাউলখ্যাপা কানু শিকদারের প্রতি সংগত ধিক্কার–কারণ ইচ্ছাশক্তির এই প্রবণতা কানু শিকদারের মধ্যেও নেই। বস্তুতপক্ষে সমগ্র উপন্যাসেই জোবেদা একটি অত্যন্ত সজীব চরিত্র।
কানু শিকদারের বন্ধু মনসব-সর্দার একটি ভালো টাইপ চরিত্র, খানিকটা কবি-র বন্ধু গুমটিম্যান রাজার মতো, কিন্তু এই একমেটে চরিত্রে জোবেদার মতো জটিলতা নেই। শুধু রাজার চেয়ে তার প্রশাসনিক শক্তি ও সে সম্বন্ধে সচেতনতা অনেক বেশি, তা সে জাহিরও করে।
প্রতিবাদ কি এই ইঙ্গিতের মধ্যেও যে, ওই গ্রামীণ বাস্তবে পাঠকের ইচ্ছাপূরক কোনো ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়, ধর্মশাসিত ও লোকাঁচার পীড়িত ওই গ্রামীণ নিঃস্বতার মধ্যে ওই মানুষগুলির ক্ষেত্রে কোনো ইচ্ছাপূরণ ঘটে না-তাদের জীবন এমনই ভাঙাচোরা থেকে যায়, এবং তাদের নানাভাবে বাস্তব থেকে পলায়ন খুঁজে নিতে হয়-হোসেন যেমন মেহেরজানের সঙ্গ থেকে পালায়, কানু শিকদার যেমন জোবেদার সঙ্গ থেকে। সে এমনিতেই স্থায়ী পলায়নের আশ্রয় পেয়েছিল তার সংগীত ও তত্ত্বচিন্তায়, কিন্তু তা তার ও জোবেদার যুগ্ম জীবনকে কোনো ইতিবাচক সমর্থন দিতে পারেনি।
কিংবা লেখক কি চেয়েছিলেন মৈমনসিংহগীতিকার কোনো একটি ট্র্যাজিক গীতিকার আদলে তৈরি করবেন তার আখ্যান?
আমরা লেখককে ‘সংশয়-সুবিধা বা বেনিফিট অব ডাউট দিয়ে তাঁর মনের কথাটি বোঝবার চেষ্টা করছি-এর জন্য কেউ কেউ সমালোচক উইম্স্যাট-এর কথা ধরে আমাদের কাজকে intentional fallacy বলে আখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু লেখক কেন এভাবে তার আখ্যানকে গাঁথলেন তা বোঝবার প্রয়োজন আছে। অথচ গ্রন্থটি আখ্যাননির্মাণের পুঁথিগত রাস্তা এবং নিটোল গল্প বলার পথ পরিহার করেও প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এ উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনাগুলি পূর্ববাংলার জনজীবনের চরিত্র ও স্বভাবকে এমনই সহজ ও বাস্তব করে এঁকেছে যে, ওই নরনারী ও নিসর্গের সঙ্গে পাঠকের যুক্ত হতে মুহূর্ত দেরি হয় না। সাধুভাষায় লেখক লিখেছেন, এবং ‘অনাধুনিক হিসেবে সমালোচিত হয়েছেন-তার উল্লেখ আমরা পাই। কিন্তু মনে হয়, লেখক একটি গদ্য গাথাকাব্য হিসেবে উপন্যাসটিকে ভেবেছিলেন, এবং সে পরিকল্পনায় সাধুভাষা-যা কখনও সহজেই কবিত্বময় হয়ে ওঠে-তার সংগত স্থান করে নিয়েছে। সেই সঙ্গে জুড়েছে-আগেই যেমন বলেছি-লোকগীতি, প্রবচন, গ্রামীণ ভাষা, লোকশিল্পের আঙ্গিকে জয়নুল আবেদিনের ছবি-সব মিলিয়ে এক বিচিত্র বহুস্বরিকতা, কিন্তু গ্রামীণ নিত্যতার মধ্যে আশ্রিত বহুস্বরীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। এর অজস্র উদাহরণ তোলা যায়। পাঠক নিজেই পদে পদে ওই ভাষাবুনোট ও সংগীতময় অন্তঃস্রোতের মুখোমুখি হবেন। কানু শিকদারের ভাষার কদাচিৎ বক্তৃতাধর্মিতাও এই প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারেনি।
আর এটাও ঠিক, লেখক কোনো এক ‘বধূ’-কে বা বঁধূদের সম্বোধন করে তাঁর আবেগঋদ্ধ নিবেদনে যেমন লিখেছেন যে, “এই দেশ, এই মানুষ ও এই প্রকৃতি জীবনের এক তুলনাবিহীন রূপ; এই প্রেম জীবনের প্রতি প্রেমেরই কঠোর কোমল অধ্যায়। যদি মন চায়- সময় করিতে পারো, একবার তাকাইয়া দেখ- আমি কেবল তোমাদের সাদর আহ্বান জানাইয়া রাখিলাম।” তখন ওই সাদর আহ্বানটি দরদি পাঠকের চিত্তে অল্পবিস্তর সঞ্চারিত হয়। ফলে এ উপন্যাসটির পাঠ শুধু বিনোদন নয়, তাত্ত্বিক সমালোচনার দৃষ্টান্ত সন্ধান নয়, তা দেশের নিসর্গ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা উজ্জীবনের একটা পাঠও হয়ে ওঠে। শিল্প ও জীবনের মধ্যে একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়। (উপন্যাস সংগৃহীত ; গল্প সংক্ষেপে দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে)

