ইরানের উপর যে বোমা ফেলা হচ্ছে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাতের প্রতিনিধিত্ব করে না। এগুলো আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার উপর একটি মৌলিক আক্রমণ, কূটনীতির বদলে সামরিক শক্তিকে বেছে নেওয়া শক্তিগুলোর ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ এবং বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার সঙ্গে একটি বিপজ্জনক জুয়ার প্রতিনিধিত্ব করে।
যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের যৌথ সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তখন আমাদের নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করতে হবে: এই পছন্দের যুদ্ধ কি বন্ধ করা যাবে? এবং আরও জরুরিভাবে, এর আসল উদ্দেশ্য কী?
এটি কোনো প্রয়োজনের যুদ্ধ নয়। ইরান আমেরিকা বা ইসরায়েলের উপর আক্রমণ করছিল না। যখন তাদের উপর আক্রমণ করা হয়েছিল তখন তারা কূটনৈতিক আলোচনায় লিপ্ত ছিল।
এটি ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের বেছে নেওয়া একটি যুদ্ধ, যা তেহরানের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তে দুর্বল প্রমাণিত দাবির মাধ্যমে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) “কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ” নিষিদ্ধ করে। “যদি সশস্ত্র আক্রমণ ঘটে” তবেই আত্মরক্ষার অনুমতি রয়েছে।
এমন কোনো আক্রমণ ঘটেনি। মার্কিন কর্মকর্তাদের উত্থাপিত “আসন্ন হুমকি” অতীতে টনকিন উপসাগর ঘটনা থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধ ২০০৩ পর্যন্ত আগ্রাসনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে, ইরানের আলি খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে, যার মধ্যে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রায় ১৬০ জন শিশুও রয়েছে। এটি আত্মরক্ষার জন্য নয়; এটি স্পষ্ট আগ্রাসন।
ভণ্ডামিটা বিস্ময়কর। যারা অন্যদের নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বক্তৃতা দেয়, তারাই সেই ব্যবস্থা ভেঙে ফেলছে। বার্তাটি স্পষ্ট: আন্তর্জাতিক আইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বাদে অন্য সবার জন্য প্রযোজ্য।
ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া হামলার প্রতিক্রিয়ায়, ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো তাদের ভূখণ্ডে হামলার জন্য লঞ্চিং প্যাড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যম এটিকে উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে তুলে ধরছে, কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি বিতর্কিত।
ইরানের হামলা আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আক্রমণের মুখে থাকা একটি রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে থাকা বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ করার, এমনকি যেসব ঘাঁটি থেকে হামলা চালানো হয় সেসব ঘাঁটির বিরুদ্ধেও।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ইরানের সংযম। তারা বেসামরিক নাগরিকদের নয়, বরং সামরিক স্থাপনাগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আগ্রাসন বন্ধ হলে তাদের হামলাও বন্ধ হবে।
এর তুলনায় মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে স্কুল, আবাসিক এলাকা এবং বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলার অভিযোগ উঠেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জটিল অবস্থান
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইন—যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—তারা এক জটিল অবস্থায় পড়েছে। ইরানের উপর হামলার জন্য তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে নিজেদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
আগামীকালই আমেরিকা এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন উত্তেজনা কমানোর স্পষ্ট কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েলি লবির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েল গতি নির্ধারণ করে, আর যুক্তরাষ্ট্র তা অনুসরণ করে—এমন অভিযোগও উঠেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-এর সরকারেরও এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করার নিজস্ব কারণ রয়েছে—অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, কৌশলগত লক্ষ্য এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ।
রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া এবং চীন আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগতভাবে জড়িত এবং দুর্বল ইরানকে নিজেদের জন্য ক্ষতি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে চীনের জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর একটি কেন্দ্র এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী।
তবে তাদের প্রভাব সীমিত। তারা কূটনৈতিক সহায়তা দিতে পারে, মধ্যস্থতা করতে পারে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অবস্থান ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তাদের নয় যারা বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করছে, বরং তাদের যারা যুদ্ধ শুরু করেছে।
বৃহত্তর কৌশল
এটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি ওয়াশিংটনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ—এই প্রশ্নও উঠছে।
রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত দেশগুলোর বিরুদ্ধে চাপ, যেমন ভেনেজুয়েলা-এর উপর নিষেধাজ্ঞা, পানামা খাল নিয়ে উত্তেজনা, ইরানের উপর হামলা এবং কিউবা-র বিরুদ্ধে নতুন হুমকি—এসব ঘটনাকে একই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখার বিশ্লেষণও রয়েছে।
ইরান ইউরেশিয়ার সঙ্গে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। রাশিয়া ও ইরানের কৌশলগত সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। একইভাবে চীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে এবং বাণিজ্যিক রুটের জন্য ইরানের উপর নির্ভর করে।
যুদ্ধ থামানোর সম্ভাবনা
এই যুদ্ধ থামানো সম্ভব, তবে সহজ নয়। এর জন্য বহু দিক থেকে চাপ দরকার—রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগ, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা, ইউরোপের স্বাধীন ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ সনদের প্রতি অঙ্গীকার।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মার্কিন জনগণের চাপ। ইতিহাসে যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধ-এর অবসানে জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের পুনর্জাগরণও প্রয়োজন হতে পারে।
সময় খুব কম। প্রতিদিন বোমা পড়ছে, উত্তেজনা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উপর আস্থা ক্ষয় হচ্ছে।
আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারগুলোর কাছে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতিকে বেছে নেওয়ার দাবি জানাতে হবে।
বিকল্পটি ভয়াবহ। মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করবে, জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলবে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে এবং রাশিয়া ও চীনসহ অন্যান্য শক্তিকে সংঘাতে টেনে আনতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—এটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী মধ্যপ্রাচ্যের দ্বার খুলে দিতে পারে এবং শীতল যুদ্ধের পর থেকে গড়ে ওঠা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে।
এই পছন্দের যুদ্ধ থামানো সম্ভব। কিন্তু কেবল তখনই, যদি বিশ্ব সত্যিই এটিকে থামাতে চায়।
- নেলসন ওং, সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সভাপতি। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

