সরকারের লক্ষ্য এখন স্পষ্ট: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা এবং তাদের জীবনযাত্রা সুরক্ষিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিষেবা মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সুবিধাজনকভাবে সুযোগ প্রদান করাও সরকারের নজরের মধ্যে রয়েছে। এসব অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে অর্থনীতিতে রূপান্তর করা হবে।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়নে সরকার আরও মনোযোগী। মুদ্রানীতির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রণয়ন জরুরি। দেশীয় ও বহির্গামী ঋণ ব্যবস্থার কিছু অংশ ঋণ পরিষেবায় চলে যাওয়ায় তা যথাযথ নজরদারি প্রয়োজন। বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণকে বিনিয়োগে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সরকারের অগ্রাধিকার।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাশ্রয়ী পরিকল্পনা গ্রহণে জোর দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য, যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয়ের নিশ্চয়তা দেবে।
তবে অর্থনীতির ওপর পূর্বের চাপ এখনও বিদ্যমান। নতুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জে ভরা প্রথম দিনগুলোতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন প্রধান দায়িত্ব। মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, যা বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদেরকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলে। একই সঙ্গে বৈদেশিক রিজার্ভের নিম্নগতি, রাজস্ব ও জিডিপির ধীরগতিও সমস্যা বাড়াচ্ছে। খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে, টাকার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধানে নজর দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন—সবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সংস্কার কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে এবং দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহী হতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা আইনি, রেগুলেটরি বা প্রশাসনিক দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।
অর্থনীতিকে দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে এখন প্রয়োজন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দক্ষ বাস্তবায়ন। সরকারের লক্ষ্য, দক্ষ টিমওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উত্তরণ এবং স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
সরকার মধ্যমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। আসন্ন ফসলের মৌসুমে সার, বীজ ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে নজর দেওয়া হবে। সরবরাহ চেইনে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ঢাকার বাজারে ২ টাকার ফুলকপি যাতে ২০ টাকায় বিক্রি না হয়, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে। যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগিয়ে মূল্য বিভাজন কমানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়া হবে। ব্যক্তি খাতকেও উৎসাহিত করে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সরকারের অগ্রাধিকার।
রাজস্ব আয় ও বিনিময় হারের ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং নিজস্ব দায়ভার ও সেবা প্রদানে সঠিক নীতি অনুসরণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সাবধানতামূলক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যেই যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগ শুধু বাণিজ্যিক কার্যকারিতা বাড়াবে না, দক্ষতা বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে। মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ও ডিজিটালাইজেশনে মনোযোগ বাড়িয়ে আঞ্চলিক বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ও শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ঘাটতির জায়গাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হবে। সরকারের উপর দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা রাখা প্রয়োজন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা উন্নত করা এসবই সরকারের মূল অগ্রাধিকার। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ সুযোগ তৈরি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগানো হবে। একদিকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও মানোন্নয়নে মনোযোগ বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য।
লেখক: ড. মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

