রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান।
তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন হিসেবে দেশের উন্নয়ন নীতিতে সক্রিয় অবদান রেখেছেন।
শিক্ষাজীবনে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন ও আর্থিক অর্থনীতিতে এমএসসি এবং সোয়াস, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণা ও পরিকল্পনা কাজ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকারের নীতি ও কর্মসূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক নীতি, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন খাত নিয়ে তার বক্তব্য ও বিশ্লেষণ দেশের অর্থনৈতিক দিশা নির্ধারণে একটি নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্প্রতি তিনি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সরকারের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাই।
উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা একটি ধসে পড়া অর্থনীতি পেয়েছি। একেবারেই খাদের কিনারে অর্থনীতি চলে গেছে। প্রতিটি নির্দেশক তা-ই প্রমাণ করে। এ রকম পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আশা এবং আকাঙ্ক্ষা জন্মেছে। জনগণ মনে করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তার জোটভুক্ত দলগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আজকের এ অচলাবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক মডেলে পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত মডেল ভোগনির্ভর। আমরা এটিকে পরিবর্তন করতে চাই। আমাদের কৌশলটা খুব পরিষ্কার। বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা অর্থনীতির মধ্যে গতি সঞ্চারণ করতে চাই; বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন, উৎপাদনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মোট কর বা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব বৃদ্ধি। কারণ কর আহরিত হলেই গণদ্রব্যে অর্থাৎ পাবলিক গুডসে বিনিয়োগ বাড়বে। ফলে শিক্ষার মান উন্নয়ন বাড়াতে পারব, সব পরিষেবা যেমন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আমরা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারব।
বেকারত্বের হার অনেক বেশি, বিশেষ করে যুব ও নারী বেকারত্ব। সেজন্য আমাদের কৌশল একদিকে যেমন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি নির্মাণ করা, অন্যদিকে সবচেয়ে বড় ফোকাস হচ্ছে দেশব্যাপী কর্মসংস্থান তৈরি। সে কারণে আমরা অর্থনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছি। আমরা চাই বিনিয়োগ থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান এবং কর আহরণ।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটে সরকারের সামনে কী চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে?
অলিগার্কিক ব্যবস্থার যে দুষ্টচক্র চলছিল, যেটা পতিত সরকার রেখে গিয়েছিল, সেখান থেকে আমরা মুক্ত করে একটা নতুন ধরনের অর্থনীতি তৈরি করতে চাই। আমরা জানি যে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে কী ধরনের অর্থনীতি পেয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যে সংঘাত চলছে তার কারণেও অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তায়, এক ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রশমনের চেষ্টা করছে।
আমরা জানি, কয়েকটি দেশের সঙ্গে স্থায়ীভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ছিল। ওই চুক্তিগুলো এ যুদ্ধের কারণে একধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আমরা সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিস্তৃত করতে চাচ্ছি, বহুমুখীকরণ করতে চাচ্ছি। উত্তর আমেরিকার দেশ হোক বা মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হোক বা অন্য দেশ থেকে; বিভিন্ন রকমের জ্বালানি আমরা আহরণ করার চেষ্টা করছি। এর মাধ্যমে আমরা নিশ্চয়তা দিতে চাচ্ছি যে উৎপাদন চালু থাকবে, বিনিয়োগ চালু থাকবে।
আরেকটি কথা আমরা উল্লেখ করেছি যে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এরই মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে আমরা জ্বালানি ক্রয় করেছি। যাতে জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় থাকে। একই সঙ্গে আমরা সারেরও পর্যাপ্ত মজুদ রাখার চেষ্টা করছি। আমরা একই সঙ্গে খাদ্যেরও পর্যাপ্ত মজুদ রক্ষা করার চেষ্টা করছি।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সরকার বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট প্রশমনে তা কীভাবে ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন?
আমরা অর্থনৈতিক কৌশলে একটা বড় রকমের পরিবর্তন সূচনা করার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে ১৮০ দিনের কর্মসূচি হিসেবে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানীসহ কতগুলো জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ১২ লাখ কৃষকের কৃষি ঋণ ১০ হাজার টাকা সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। দারিদ্র্য বাড়ছে। এ মুহূর্তে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তার হাঁসফাঁস অবস্থা।
এ পরিস্থিতিতে কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। ১২ লাখ কৃষক অর্থাৎ ৬০ লাখ মানুষ উপকার পাবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি তখনই অগ্রসর হবে যদি তার ৫০ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ নারীদের সেই সহায়তা দান করা যায়। ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রথমত এটি সর্বজনীন। প্রথমে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীদের এ কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। পরে সব নারীকেই এ কার্ডের আওতাভুক্ত করা হবে।
দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে তালিকা করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করে স্কোরের ভিত্তিতে তিন ধরনের মানুষকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। অতীতের মতো এবার অপচয় হবে না। উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সব ধরনের ত্রুটিমুক্ত করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাবে। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে যাবে। ভবিষ্যতে আমরা ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ডের দিকে যাব।
তৃতীয়ত, আমরা যে কাজটি করছি সেটি হচ্ছে সমাজে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় যারা বড় রকমের ভূমিকা রাখেন তাদের জন্য সম্মানী। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং বিভিন্ন উপাসনালয়ের পুরোহিত, সেবায়েত, অধ্যক্ষ বা কর্তাব্যক্তি; তাদের জন্য ঈদের আগেই আমরা সম্মানী তুলে দিয়েছি। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
চতুর্থত, আমাদের কৃষকদের ও ভোক্তাদের সুরক্ষায় আমরা কাজ করছি। আশা করছি, পহেলা বৈশাখের মধ্যে আমরা কৃষক কার্ডের প্রি-পাইলটিং শুরু করব। পর্যায়ক্রমে কৃষকদের ১০টি সেবা দেয়া হবে। ফলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ন্যায্যমূল্য পাবেন।
আমরা জানি, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় তথাকথিত তলাবিহীন ঝুড়ি অভিধা থেকে মুক্ত হয়ে একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয় দেশ। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সময় অর্থনীতির আধুনিকায়ন ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সময় পদক্ষেপগুলো নেয়ার মাধ্যমে একটা গণতান্ত্রিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
আপনি বলছেন, বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে একটা কর্মসংস্থানের চেইন তৈরি হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে ৫৮ শতাংশ। অনেক কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বিনোয়োগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর যে পরিকল্পনা তা কতটুকু বাস্তবসম্মত?
এটা বাস্তবসম্মত। অতীত ইতিহাস আমাদের সেই সাক্ষ্য দেয়। একটি উদাহরণ দেয়া যায়। সত্তরের দশকের তেল সংকটকালে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল। অন্যদিকে তেলের দাম বাড়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বা উপসাগরীয় দেশগুলোয় উদ্বৃত্ত তহবিল বেড়ে যাচ্ছিল। বাংলাদেশে উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা। তখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার নিজস্ব উদ্যোগে সংকট থেকে সুযোগ তৈরি করে সংকটের সমাধান করেন। ওই দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সমাধান করেছেন। তার মানে হচ্ছে যে আমাদের অতীতের ইতিহাস বলে যে যেকোনো সংকটকে আমরা শুধু মোকাবেলাই করি না, সংকটকে আমরা সুযোগে রূপান্তরিত করতে পেরেছি এবং অধিকাংশ জনগণের সুফল বয়ে আনতে পেরেছি।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার একটা বিনিয়োগ সম্মেলন করেছিল। তখন অনেক দেশের বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে এসেছিলেন। তারা একটা কথাই বলেছিলেন, তারা নির্বাচিত সরকার দেখতে চান। তারা মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবেন। সেই সময়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পরিকল্পনা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত কৌশল ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলাম।
বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকর্ষণ করতে পৃথিবীব্যাপী বেস্ট প্র্যাকটিস ওই বিনিয়োগবিষয়ক কৌশলপত্রে যুক্ত করে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপন করেছি। লক্ষ করলে দেখা যাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এফডিআই কিংবা দেশীয় বিনিয়োগ বাড়েনি। আমরা যে নীতিকৌশলগুলো উপস্থাপন করেছি তার মাধ্যমে আস্থারও সুযোগ হয়েছে।
সংকট আসতেই পারে কিন্তু সেই সংকটকে বা সেই সমস্যাকে বা সেই চ্যালেঞ্জকে সরকার কীভাবে মোকাবেলা করে, সেটাই সরকারের সার্থকতা। আমাদের যেহেতু কৌশলগুলো নির্ধারিত, সেহেতু সেই কৌশলগুলো নিয়ে এরই মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে।
পূর্ব এশিয়ার দেশ তথা চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ লক্ষ করছি। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকেও বিনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে। তার মানে আস্থার যে সংকট ছিল, তা কাটিয়ে আমরা আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর থেকে শ্রম পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং এ ব্যাপারে তদন্তের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপকে আপনি কীভাবে দেখেন?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করা হয়েছে। সেটার অন্যতম কারণ ছিল শ্রমিকের অধিকার নিয়ে। অতীতের পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় দুটো বিষয় নিয়ে মামলা চলছিল। আগে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল তা শ্রমবান্ধব, পরিবেশবান্ধব কিংবা নারীবান্ধব ছিল না। লক্ষ করবেন, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই কিন্তু আমরা শ্রম অধ্যাদেশ নিয়ে এসেছি। আমরা শ্রমবান্ধব আইন করছি এবং এর মাধ্যমে শ্রম অধিকার নিশ্চিত হবে।
একই সঙ্গে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন ফোরামে আমরা আলোচনা করছি, আলাপ করছি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের একটা টানাপড়েন ছিল। আমরা সম্মানসূচক ও দেশবান্ধব সমাধানের দিকে যাচ্ছি। আমরা কৌশলগত বাস্তববাদে বিশ্বাস করি এবং আমাদের নিজস্ব স্বার্থ অর্থাৎ সবার আগে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। এর মাধ্যমে আমাদের বিনিয়োগ বাড়বে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
নতুন সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরকারের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে?
নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইশতাহারের প্রথম ও দ্বিতীয় ভিত্তি যদি লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ধরেছি।
সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে যেটি দরকার ছিল তা হচ্ছে নির্বাচিত নেতৃত্ব বা নির্বাচিত নির্বাহী। অর্থাৎ নির্বাচিত নির্বাহীরাই সরকার পরিচালনা করবে এবং আমলাতন্ত্রের কাজ হচ্ছে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন। প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই একটা বড় রকমের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তা হলো জনগণের ম্যান্ডেটকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কমিটমেন্ট দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা যে বড় পরিবর্তন এনেছি তা হচ্ছে নির্বাচিত নির্বাহী বিভাগ নীতি কৌশল প্রণয়ন করবে নির্বাচনী ইশতাহারের ভিত্তিতে এবং সরকারের প্রশাসনযন্ত্র সেগুলোকে বাস্তবায়ন করবে। এটা আগে হয়নি।
বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বাইরে আর কোন ধরনের পলিসির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে আপনাদের?
সক্ষমতা বৃদ্ধি করে জনগণের সরকার পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি ইশতাহারে দেয়া আছে। এ ইশতাহার বাস্তবায়ন করলে আমাদের যেমন বিনিয়োগ বাড়বে, তেমনি উৎপাদন বাড়বে ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এতে আমাদের কর জালও সম্প্রসারিত হবে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করা যাবে।
যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করব। কারিগরি শিক্ষার বহুল প্রসার তার মধ্যে একটি। শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার আমাদের সরকারের একটি প্রধান অগ্রাধিকার। মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়ালে তা যেমন অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের ঘাটতি কাটাবে, তেমনি বৈদেশিক শ্রমবাজারের চাহিদাও পূরণ করবে। বিদেশে আমাদের অধিকাংশ শ্রমশক্তি নিম্ন দক্ষতার ও অল্প আয়ের পেশায় নিযুক্ত আছেন।
দক্ষতা যদি বাড়ানো যায় তাহলে আমাদের প্রবাসী আয় যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর আহরণও বাড়বে। ফলে আমরা আবার জনদ্রব্যে বেশি মাত্রায় বরাদ্দ দিতে পারব। তার মাধ্যমে একদিকে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে, কর্মসংস্থানের দক্ষতা বাড়বে এবং আমরা আমাদের উদ্দিষ্ট লক্ষ্য তথা ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাব।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বর্তমান সরকার অন্যান্য দেশ থেকে জ্বালানি ক্রয় করার কথা জানিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ কোন দিকে যাচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির সংকট ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ধরে নিয়ে বহুবিধ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মধ্যমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার লক্ষ্যে অনেকগুলো ব্যবস্থা আমরা নেব। তিনটি বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ পতিত সরকারের সময় আমরা লক্ষ করেছি যে গ্যাস উত্তোলনে তেমন উদ্যোগ নেয়া হয়নি, পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা মারাত্মকভাবে বেড়েছিল। আমরা তার পরিবর্তন চাই। আমাদের বড় ধরনের সিস্টেম লস হয়েছে, ক্যাপাসিটি চার্জ বা অন্যান্য ভর্তুকিতে বড় অংকের অর্থ ব্যয় হয়েছে।
সে ভর্তুকির ফলাফল কিন্তু সাধারণ জনগণ পায়নি। ক্রয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অপচয় কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পতিত সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। আমরা চেষ্টা করব সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বাড়ানোর। যার ফলে আমরা একটা সবুজ ভবিষ্যতের দিকে এবং একটা রূপান্তরকামী শিল্পায়নের দিকে যেতে পারব।
আমাদের মূল লক্ষ্য সর্বজনের অর্থনীতি গড়ে তোলা। আমরা যেমন ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছি, কৃষক কার্ডের কথা বলেছি, একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে অনেকগুলো কৌশল আমরা নির্ধারণ করেছি; যাতে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বেড়ে ওঠে। আমাদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে দক্ষতামুখীন, যার ফলে প্রকৃত মজুরিও বাড়বে।
ব্যাংক, আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার নিয়ে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা কী?
আমাদের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের সিংহভাগই আসে ব্যাংক ঋণ থেকে, যেখানে বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোতে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশে মূলধন সংগ্রহ ও সরবরাহে পুঁজিবাজারের অবদান মাত্র ১২ শতাংশ। এভাবে পুঁজিবাজার চলতে পারে না। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি—আমরা ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মার্কেটের দিকে যেতে চাই। যাতে সবাই পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
অতীতে পুঁজিবাজারে যেসব কেলেঙ্কারি ঘটেছে সবগুলোই কিন্তু অন্য সরকারের সময় হয়েছে। আমরা পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রডাক্ট নিয়ে আসতে চাচ্ছি। শুধু ইকুইটি, বন্ড নয় আমরা কিন্তু ইসলামিক স্টক এক্সচেঞ্জের মতো ধারণাগুলো নিয়েও চিন্তা করছি। সুকুক বন্ড নিয়ে আমরা অন্যভাবে চিন্তা করছি। আমরা বন্ড মার্কেটে সাধারণ প্রচলিত এবং ইসলামিক প্রডাক্টও আনার চেষ্টা করছি। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে আমরা বহুমুখী করতে চাই এবং তাতে সব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই।
এ মুহূর্তে অর্থের জোগান সরকার কীভাবে করছে? ঋণ নেয়ার কোনো পরিকল্পনা কি আপনাদের আছে?
আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল ঋণের পাহাড় পেয়েছি। সেটা অভ্যন্তরীণ ঋণ বলেন বা বৈদেশিক ঋণ। আপনারা জানেন, ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সরকারের যে পরিমাণ ঋণ ছিল তার বিপরীতে পতিত সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩২৪ শতাংশ। ঋণ বাবদ পরিশোধিত খরচ আমাদের পরিচালন ব্যয়ে একটা বিরাট অংশ থাকছে। এর সঙ্গে রয়েছে বেতন-ভাতা ও নানা ভর্তুকি। আমরা এ রকম পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। সেখান থেকে আমাদের একটাই উত্তরণের রাস্তা, আমরা কীভাবে প্রুডেনশিয়াল (দক্ষ) রাজস্ব ব্যবস্থাপনা করব। যার মাধ্যমে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়বে।
এটা খুবই দুঃখজনক যে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আমাদের অগ্রাধিকার হবে করের হার না বাড়িয়ে কীভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো যায়। সেজন্য আমরা এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অংশীভূত যে তিনটি বিভাগ আছে—শুল্ক বা কাস্টমস ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর সেখানে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছি। কর পরিহার, কর অব্যাহতি বা কর জালিয়াতির যে সংস্কৃতি ছিল তা থেকে বেরিয়ে একটি সৃশৃঙ্খল ব্যবস্থায় যেতে কাজ করবে এ টাস্কফোর্স।
এরই মধ্যে আমরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে আয়কর এবং অন্যান্য কর আহরণের দিকে যাচ্ছি। আমরা ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই এবং সেই লক্ষ্যেই আমরা কর ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। অতীতে কর আহরণ না বাড়ার পেছনে ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড না বাড়া। আমরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর মাধ্যমে কর জালও সম্প্রসারিত করব।
আমরা রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে সমন্বয়ের চেষ্টা করছি। পতিত সরকারের ফেলে রাখা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির সমন্বয় প্রয়োজন। একদিকে বিনিয়োগ কমেছে, অন্যদিকে দারিদ্র্য বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বাড়ছে—তাই আমরা রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের দিকে যেতে পারি। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সংকেত দিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য হবে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ। সূত্র: বণিক বার্তা

