২০১৫ সালে ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবির চেয়ারম্যান ইউকে সিনহা ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাঁর পাশে ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক খাইরুল হোসেন।
সেই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক হিসেবে উপস্থিত থাকা সময় আমি অনুভব করেছিলাম, যেন এক পর্বতের পাদদেশে ছোট্ট কোনো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। বিষয়টি দৈহিক উচ্চতার কারণে নয়, বরং দুই দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার কারণে। ভারতের আইনপ্রণেতারা সেবির একটি সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করেছিলেন, এমনকি সিনহার চেয়ারও নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু সিনহা তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি সেই ঘটনায় বক্তৃতায় বলেছিলেন, “শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছিল যে রাজনীতিবিদেরা ভুল ছিলেন, আর সেবি সঠিক ছিল।” সিনহার পাশে বসা বিএসইসির চেয়ারম্যান খাইরুল হোসেনেরও কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলেছিল। তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের বোনাস শেয়ার বিতরণ এবং মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছিলেন। দুই সিদ্ধান্তই পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থপরিপন্থী এবং মাফিয়াতন্ত্রের পক্ষে গিয়েছিল বলে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে খাইরুল কমিশন জানিয়েছিলেন, তারা এসব সিদ্ধান্ত সরকারের চাপে নিয়েছিলেন।
সেবির চেয়ারম্যানের কথাটি এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—রাজনীতিবিদরা ভুল করলেও, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সঠিক সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেছেন। এখন সবার নজর বিএসইসির ওপর। নিয়োগ প্রার্থীরা তদবির চালাচ্ছেন, আলোচনা চলছে—কে যোগ্য, কে প্রভাবশালী, কার হাতে সংস্থা থাকলে ভালো হবে।
২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের পর বিএসইসি স্পনসর-ডিরেক্টরদের হাতে দুই শতাংশ শেয়ার ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছিল। এই বাধ্যবাধকতা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়। শুনানিতে আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, “সিএসইসির টুসিসি ধারা সংবিধানকে সুপারসিড করছে।” বিচারপতিদ্বয় শুধু মুচকি হেসেছিলেন এবং বিএসইসির সিদ্ধান্ত বলবৎ রেখেছিলেন।
বাংলাদেশে অন্য কোনো সংস্থার হাতে এত শক্তিশালী আইনি রক্ষাকবচ নেই, যেমন বিএসইসির আছে। তবু কখনো কখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘নিয়ন্ত্রিত’ হয়ে থাকে। সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ সিদ্দিকী জানিয়েছিলেন, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চাপ আসা নিয়ে তিনি কখনো চিন্তিত হননি। কিন্তু পরবর্তী কমিশন ও চেয়ারম্যানদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিয়োগের পেছনে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা থাকায় তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি। কিছু কমিশনারের নিয়োগ পুনর্বাসনমূলকও ছিল। যেমন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ কমিশনে এসে বলেছিলেন, “সরকার আমাকে অবসর কাটানোর সুযোগ দিয়েছে।”
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিয়োগ নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। একপক্ষ বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাস্টারগণ’ যথাযথভাবে সব শেষ করে গেছেন, তাই তাদের লোকই নিয়োগ পাওয়া উচিত। অন্যপক্ষ বলছে, ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ তৈরি হতে পারে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করেন, সরকার এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেবে যারা কেবল পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থে, সুশাসন এবং অর্থনীতির উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবেন। নিয়োগপ্রাপ্তরা যেন শুধু পুরস্কৃত বা অবসর কাটানোর জন্য আসেন না, বরং প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
লেখক: মুহম্মদ মোফাজ্জল: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

