বিশ্ব এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেয় না। একে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং নীরবে উপেক্ষা করা হয়—একটি স্থিতিশীল আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি অস্থিতিশীল তামাশা হিসেবে।
‘দ্য পাওয়ার অব দ্য পাওয়ারলেস’ গ্রন্থে ভাকলাভ হ্যাভেল এমন একটি ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে মিথ্যা আকস্মিক নয়, বরং ভিত্তিগত। এমন একটি ব্যবস্থা, যা কেবল মিথ্যাকে সহ্যই করে না, বরং তা অপরিহার্য করে তোলে, এর পুনরুৎপাদন করে এবং এর মধ্যেই বেঁচে থাকে: “যেহেতু শাসনব্যবস্থা তার নিজের মিথ্যার কাছেই বন্দী, তাই তাকে সবকিছুকেই বিকৃত করতে হয়।”
সাম্যবাদের শেষ পর্যায়ে হ্যাভেল যা শনাক্ত করেছিলেন, তা কেবল দমন-পীড়ন ছিল না; বরং আরও সূক্ষ্ম কিছু ছিল: এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ভাষা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সত্যের স্থান দখল করে নেয় অভিনয়।
সেই রোগনির্ণয়টি এখন অস্বস্তিকরভাবে সমসাময়িক মনে হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য মিথ্যা বলা এখন আর কেবল একটি ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়। এটি একটি শাসন-পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।
তার প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ৩০,০০০-এরও বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি করেছিলেন—যা দিনে গড়ে ২০টিরও বেশি এবং শেষ বছরে তা বেড়ে দিনে প্রায় ৪০টিতে পৌঁছেছিল।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিকৃতি ছিল না। এটি ছিল পরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল এবং অবিরাম। তথ্য যাচাইকারীরা এটিকে বর্ণনা করার জন্য নতুন নতুন শ্রেণি উদ্ভাবন করতে বাধ্য হয়েছিলেন: যেসব দাবি এতবার পুনরাবৃত্তি করা হতো যে সেগুলোকে আর ভুল বলে ভুল করার কোনো উপায় থাকত না, সেগুলোর জন্য ‘অন্তহীন পিনোকিও’ নামটি ব্যবহার করা হতো। কিছু দাবি কয়েক ডজন, এমনকি শত শত বার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল।
আর সেটি ছিল কেবল তাঁর প্রথম মেয়াদ। আমরা এখন যা দেখছি, তা সেই ধারা থেকে কোনো বিচ্যুতি নয়; বরং তারই তীব্রতা বৃদ্ধি। এর পরিধি বেড়েছে, ঝুঁকি আরও গভীর হয়েছে—এবং এর পরিণতি হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী।
তারা এখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
মিথ্যার স্রোত
কিন্তু এখানেও, ভাষাই প্রথম বলি হয়। ট্রাম্প এটিকে এর আসল নামে ডাকতে সতর্ক থেকেছেন। যুদ্ধ নয়, বরং একটি “অপারেশন”, একটি “সীমিত অভিযান”, এমনকি একটি “অভিযান”।
বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে: হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে, বিমানবাহী রণতরীগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে, বিমান-সম্পদ একত্রিত করা হয়েছে এবং বিশেষ বাহিনী প্রবেশ করানো হয়েছে।
যেটিকে একটি সীমিত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা এখন একটি ক্রমবর্ধমান সংঘাতে পরিণত হয়েছে, যা একাধিক রণাঙ্গন জুড়ে বিস্তৃত হয়ে অঞ্চলটিকে এবং এর বাইরেও গ্রাস করার হুমকি দিচ্ছে।
এটি কয়েক ঘণ্টার জন্য চলার কথা ছিল। ঘণ্টাগুলো দিনে পরিণত হয়েছে, আর দিনগুলো সপ্তাহে। এর শেষ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
এটি এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে বাজারনীতিকে সরকার ও সাম্রাজ্যের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। এখানে সবকিছুই দর-কষাকষিযোগ্য ও লেনদেনমূলক। এমনকি সত্যও দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি “সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন” হয়ে গেছে। কয়েক মাস পর, তিনি আরও সামরিক পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দিতে সেই একই কর্মসূচির দোহাই দেন। এমন একটি কর্মসূচি, যা দৃশ্যত একই সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং অক্ষত; বিলুপ্ত, অথচ এখনও জরুরি।
তারপর শুরু হয় ধারাবাহিক দাবি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে, যদিও পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা তীব্রতর হচ্ছিল এবং বিতর্কিত জলসীমায় মার্কিন বাহিনীকে আরও রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য করা হচ্ছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে এবং একই সময়ে তেল আবিবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনে তেহরানের সক্রিয় ও অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
গত সপ্তাহান্তে, ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দেন, যা বাজার এবং সরকার উভয়ের মধ্যেই তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এরপর তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে “ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে উন্নত পর্যায়ের আলোচনায় নিযুক্ত আছেন, কিন্তু এর জবাবে সংসদীয় স্পিকার, তাঁর ডেপুটি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করেন।
তবুও, ট্রাম্প তা চালিয়ে গেছেন—ক্রমাগত বিজয় ঘোষণার মাধ্যমে। লড়াই চলতে থাকা এবং উত্তেজনা আরও গভীর হওয়া সত্ত্বেও তিনি দাবি করে চলেছেন যে যুদ্ধে জয় এসেছে।
সত্যের ওপর আক্রমণ
বিজয় অর্জিত হয় না; তা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তা চাপা পড়ে যায়।
কোনো নেতৃত্বের পতন ঘটেনি, কোনো পরাজিত রাষ্ট্রও নেই। বরং, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যা তার কার্যক্রম, আঘাত হানা এবং টিকে থাকা অব্যাহত রেখেছে।
এইখানেই জর্জ অরওয়েলের প্রসঙ্গ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ ধরনের ব্যবস্থায় ভাষা উল্টে যায়: যুদ্ধ হয়ে ওঠে শান্তি, ধ্বংস হয়ে ওঠে স্থিতিশীলতা।
কিন্তু ট্রাম্পের পদ্ধতি আরও এক ধাপ এগিয়ে। তাঁর অবিরাম ‘ভুয়া খবর’ ব্যবহার কেবল গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ নয়; এটি সত্যের অস্তিত্বের সম্ভাবনার ওপরই আঘাত।
উদ্দেশ্য হলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা—সত্য ও কল্পকাহিনীর সীমারেখা এমনভাবে ঝাপসা করে দেওয়া, যাতে দর্শক আর কোনোটিকেই বিশ্বাস না করে। সত্যকে কল্পকাহিনী বলে মনে হতে শুরু করে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পুনরাবৃত্ত কল্পকাহিনী সত্যের গুরুত্ব পায়। দর্শক আর জিজ্ঞাসা করে না কোনটি সত্য; তারা শুধু জিজ্ঞাসা করে, কী দাবি করা হচ্ছে।
মাঝে মাঝে এটি প্রহসনে পরিণত হয়। একটি সমাবেশে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে ইরানের নেতৃত্ব তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে চায়, এরপরই নাটকীয়ভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন: “না ধন্যবাদ, আমি এটা চাই না।”
যেসব দাবি কল্পকাহিনীতে খারিজ হয়ে যেত, সেগুলোই এখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পদ থেকে করা হয় এবং প্রশংসিত হয়। যখন মিথ্যাচার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন অযৌক্তিকতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
পরিশেষে, ট্রাম্প ক্ষমতার ওপর বাণিজ্যিক যুক্তির এক চরম উদাহরণ। তিনি যেভাবে ব্যবসা করতেন, সেভাবেই শাসন করেন: সীমাহীন চুক্তি, নীতিহীন প্রভাব, লাগামহীন লোভ।
এটি রাষ্ট্রনীতি নয়; এটি বাজারনীতিকে সরকার ও সাম্রাজ্যের পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা। এখানে সবকিছুই লেনদেনযোগ্য—এমনকি সত্যও।
তিনি বাস্তবতার বর্ণনা দেন না; তিনি তা নির্মাণ করেন। তাঁর বক্তব্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং প্রভাবিত করতে, অভিভূত করতে এবং চমকে দিতে তৈরি করা হয়।
সামঞ্জস্য এখানে কোনো বিষয় নয়; ফলাফলই আসল। বাস্তবতা বাধা দিলে তা বাড়িয়ে বলা হয়। তথ্যপ্রমাণ বিরোধিতা করলে তা বদলে দেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে। মিত্ররা দ্বিধাগ্রস্ত, প্রতিদ্বন্দ্বীরা হিসাবি। একসময়ের নেতৃত্বাধীন শক্তিকে এখন অনেকেই আর আগের মতো গুরুত্ব দেয় না।
এটি আর কেবল রাজনীতি নয়—এটি এক ডার্ক কমেডি।
- সোমায়া ঘান্নুশি: একজন ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

