বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য যেন এক আগ্নেয়গিরি, যার লাভা শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ—এই দ্বিমুখী সংকটে বিশ্ব যখন দিশেহারা, তখন মস্কোর ক্রেমলিনে বসে ভ্লাদিমির পুতিন এক দীর্ঘমেয়াদী দাবার চাল চালছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে পূর্ণমাত্রায় স্থল অভিযান (Ground Invasion) শুরু করে, তবে তা হবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার জন্য এক আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
‘ইরান ট্র্যাপ’: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যেকোনো শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘কৌশলগত অতি-বিস্তার’ (Strategic Overextension)। আমেরিকা ইতিপূর্বে ভিয়েতনাম, ইরাক এবং আফগানিস্তানে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে, ইরান হতে পারে তার চেয়েও ভয়াবহ।
-
ঐতিহাসিক রেফারেন্স: ১৯ শতকে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এবং ২০ শতকে হিটলারের রাশিয়া অভিযান তাদের পতনের মূল কারণ ছিল। ঠিক তেমনিভাবে, আধুনিক সময়ে আফগানিস্তানকে বলা হয় ‘সাম্রাজ্যের কবরস্থান’ (Graveyard of Empires)। আমেরিকা ২০ বছর সেখানে যুদ্ধ করেও শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। ইরান ভৌগোলিকভাবে আফগানিস্তানের চেয়েও দুর্গম এবং সামরিকভাবে অনেক বেশি সুসংগঠিত।
শক্তির ভারসাম্যহীনতা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
যেকোনো যুদ্ধে শুধু প্রযুক্তি বা অস্ত্র দিয়ে জয়ী হওয়া যায় না, বরং ‘ইচ্ছা শক্তি’ (Willpower) বড় ভূমিকা রাখে। ইরানের জন্য এটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই (Existential War), যা তাদের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে। বিপরীত দিকে, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
-
ইতিহাসের শিক্ষা: ভিয়েতনাম যুদ্ধে (১৯৫৫-১৯৭৫) আমেরিকা সামরিকভাবে অনেক শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল কেবল জনসমর্থন হারানো এবং উত্তর ভিয়েতনামের জনগণের অদম্য ধৈর্যের কারণে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ (Asymmetric Warfare) ঝুঁকি প্রবল।
ওডেসা এবং রাশিয়ার কৌশলগত চাল
পুতিনের মূল লক্ষ্য কেবল ইউক্রেন নয়, বরং কৃষ্ণ সাগরের নিয়ন্ত্রণ। আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকবে, তখন রাশিয়ার জন্য ইউক্রেনের ওডেসা (Odessa) বন্দর দখল করা সহজ হয়ে যাবে। ওডেসা হারানো মানে ইউক্রেনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া এবং ইউরোপের ওপর রাশিয়ার প্রভাব আরও সুসংহত হওয়া।
বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ইরানে আক্রমণ মানেই বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০% পার হয় ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে। ইরান এই পথ বন্ধ করে দিলে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকিয়ে দেবে বলে ধারণা করা যায়।
-
তথ্যসূত্র: ১৯৭৩ সালের ‘আরব তেল নিষেধাজ্ঞা’ (Oil Embargo) বিশ্ব অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা এনেছিল, ইরানের যুদ্ধে তার চেয়েও ভয়াবহ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশগুলো বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের বদলে ‘স্বনির্ভর অর্থনীতি’র দিকে ঝুঁকবে, যা আমেরিকার একক অর্থনৈতিক আধিপত্য বা ডলারের দাপট কমিয়ে দেবে।
বহুমুখী বিশ্বের উত্থান (The Rise of a Multipolar World)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ‘এককেন্দ্রিক বিশ্ব’ (Unipolar World) যেখানে আমেরিকার কথাই শেষ কথা ছিল, তা এখন ম্লান হতে শুরু করেছে। আমেরিকা যদি একই সাথে ইউক্রেন এবং ইরানের মতো দুটি ফ্রন্টে লড়াই করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তবে চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করে তুলবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো (যেমন- জাতিসংঘ) তাদের কার্যকারিতা হারাবে এবং বিশ্ব ছোট ছোট আঞ্চলিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়বে।
পরিশেষে, সাম্রাজ্যগুলো রাতারাতি ধসে পড়ে না; তারা ধসে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়ের মাধ্যমে। ভ্লাদিমির পুতিন খুব ভালো করেই জানেন যে, সরাসরি আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করার চেয়ে আমেরিকাকে তার নিজের ভুলের জালে আটকে ফেলা অনেক বেশি কার্যকর। আমেরিকা যদি ‘ইরান ফাঁদে’ পা দেয়, তবে তা হবে পুতিনের জন্য এক চূড়ান্ত বিজয় এবং আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের সূচনা। এখন দেখার বিষয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন পথে হাঁটেন!
- এফ. আর. ইমরান: নির্বাহী সম্পাদক, সিটিজেনস ভয়েস।

